ভালোবাসায় বাবা – তিথি রহমান

Home/ছোট গল্প/ভালোবাসায় বাবা – তিথি রহমান

ভালোবাসায় বাবা – তিথি রহমান

অশ্রুজলে ওড়নার একপাশ ভিজে গাঢ় রং ধরেছে, তবুও সে কেঁদেই চলেছে একটানা। একহাতে ডায়েরি টা ধরে তার ভাঁজে আঙুল গুঁজে অন্যহাতে ওড়না চোখে চেপে রেখেছে। একটা শুধু অস্বাভাবিক ঘটনা চাইছে সে এই মুহূর্তে। শুধু ফেলে আসা সেইদিনের একটা ঝলক আবার ফিরে চায়, শুধু একটা বার মন থেকে ভালোবাসা দেবার জন্য। হৃদয়ের টান হৃদয় দিয়ে বুঝবার জন্য। কিন্তু এ অসম্ভব, কল্পনাই শুধু। হয়তো এই কল্পনাই তাকে শেষ দিন পর্যন্ত কষ্ট দেবে। হোক না সব বাস্তবতার ঊর্ধ্বে, তবুও। মিরাকল বলে কিছু কি নেই সত্যিই!!
বাবার প্রিয় সংলাপ ছিল
“ও জিন্দেগী ক্যায়সি,জিসমে কোই না-মুমকিন সাপনা না হো… ”
“খামোশি ” ছবির নাম, শাশ্বতী দেখেনি। কারন বাবার পছন্দ। একটা বয়সের পরে সে বাবার পছন্দ সবই অপছন্দ করতে শুরু করেছিল। কারন ছিল, ঘৃণা করত সে একরকম বাবাকে। তার কিশোরী মনে এটাই ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে মায়ের মৃত্যুর জন্য বাবাই দায়ি। বাবার কেয়ারলেস মনোভাবই দায়ি। কিন্তু আজ, বাবার মৃত্যুর ৭ বছর বাদে সে এমন এক সত্যি জানল, যার জন্য বাবার প্রতি তার ভালোবাসা বেড়ে গেল।
বাবার দেখে শেখা ডায়েরিতে চিঠি লেখা শিখেছে সে। উদ্দেশ্য তার অদেখা মা। বাবা মায়ের গল্প এমন ভাবে করেন যেন এইমাত্র সামনে দিয়ে হেঁটে গেল, আর তার অস্তিত্বের রেশ এখনো রয়ে গেছে। শাশ্বতী যখন বেশি ছোট সে ঘাড় ঘুরিয়ে মাকে খুঁজত, যখন বাবা মায়ের কথা তুলতেন। বাবা,ডাঃ আবীরের বেশ মজাই লাগত। আস্তে আস্তে শাশ্বতী বড় হতে লাগল বাবার ছায়াতলে। বাড়িতে ছিল তারা বাপ-বেটি, ড্রাইভার, এক পুরানো মহিলা, উনিই শাশ্বতীকে দেখে রাখতেন। মহিলা এক সময় শাশ্বতী র জন্য তার নিজের মেয়ে মজুকে আনার কথা বললে আবীর সাহেব রাজী হয়ে যান। নিজের চেম্বার, হাসপাতাল সামলানোর পরে ঘরে ফিরে দুষ্টু শাশ্বতী কে সামলানো খুব কষ্টকর হয়ে যেত।তাই মজুকে আসার কথা বলায় আবীর সাহেব একটু রিলিফই পেলেন। মেয়ের বয়স যখন সাড়ে তিন মাস তখন স্ত্রী গত হলেন হঠাৎ। তারপর থেকে একা মানুষ করছিলেন। এত বছরে বিয়েও করেন নি। শেষ পর্যন্ত ওই মজুই সাথে ছিল শাশ্বতীর। শাশ্বতীর প্রিয় মানুষদের একজন মজুফুপু।
আজ একথা ভেবে রাগ হলো খুব।
নিজের ডায়েরি তে বাবাকে লেখা কোনো কথাই নেই। শুধু মায়ের নামে উৎসর্গকৃত চিঠি। তাতে বাবার নামে অভিযোগ হাজারটা। আজ মনটা বিষাদে ভরে গেল তার। নিজের অজান্তেই কলম তুলে নিল হাতে।লিখতে শুরু করল,
“বাবা,
আজ আমার একটা অসম্ভব ইচ্ছা জাগছে মনে। জানি সে ইচ্ছা, ইচ্ছা হয়েই রয়ে যাবে, কিন্তু ইচ্ছাটা আর মন থেকে মুছে যাবে না। তুমি যখন অদৃশ্য মায়ের সাথে কথা বলতে, আমি এদিক ওদিক চাইতাম মাকে দেখার জন্য। তখন একবার বলেছিল, “যদি এমন কল্পনা না থাকে, তবে বাঁচা কঠিন হয়ে যাবে। বাস্তব আর কল্পনা মিলিয়েই জগৎ, আর সেই জগৎ টাই সবচেয়ে সুন্দর। ”
আজ সেই জগতের অংশ হতে চাই, কিন্তু পারছি না বাবা।
ছোট্ট আমাকে একা হাতে মানুষ করেছ। নিজের এতো ব্যস্ততার মাঝেও আমার জন্য সময়ের অভাব তোমার হয়নি কখনো। জানো বাবা, আমার বাবা মা সবই তুমি ছিলে। মা নেই বলে কষ্ট হতো যখন স্কুলে দেখতাম অন্য কারো মা এসে রেখে যাচ্ছে। ব্যস ওটুকুই।তারপর সবটাই তুমিময় ছিলে।
এরপর এলো মজুফুপু। এসে আমার হৃদয় দখল করে নিল। তারপর আমাকে আমার গল্প বলল। কিশোরী আমার তখন ভুল ঠিক বিচার করার বয়সও হয়নি।
আচ্ছা বাবা, সত্যিই কি আমি তোমার মেয়ে নই? আমাকে এনেছিলে বলে মা চলে যায়? মা সুইসাইড করেছিল!! আমার জন্য তোমরা আলাদা হয়ে গিয়েছিলে?
মজুফুফুর এসব কথা প্রশ্ন হয়ে মনে গেঁথে যায়। নিজের প্রতি, তোমার প্রতি বিতৃষ্ণা গড়ে ওঠে আস্তে আস্তে। একটা সময় মজুফুপু এটাও বলেছিল তোমার সাথে নাকি তার বিয়ের কথা ছিল! তুমি তাদের ফিরিয়ে দিয়েছিলে। তাদের যে অবর্ণনীয় কষ্ট, তা বলতে বলতে মজুফুপু কেঁদে ফেলতেন। তখন আমার কতই বয়স!! ১৩/১৪। তোমাকে ভিলেন মনে হতো। মনে হতো আমার অস্তিত্ব, তোমার সাথে আমার থেকে যাওয়া সবটাই কোনো ষড়যন্ত্রের অংশ।
এই ধারনা আরো বেশি করে মনে গেঁথে যায় যখন তোমার এক জুনিয়রের সাথে মজুফুপুর বিয়ে দিলে। মজুফুপু সেদিন বলেছিলেন তুমি আমার কাছ থেকে উনাকে সরিয়ে দিতে উনার বিয়ে দিলে। তাতে তোমার প্রতি আমার ঘৃণা বেড়ে যায়। আমি অনেক সময়ই তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছি। কষ্ট দিয়েছি। আমার নিজেরও কষ্ট হতো এই ভেবে যে আমি তোমার কেউ নই, তবুও তুমি আমাকে এতো আদরে আগলে রেখেছ,আর আমি তোমার সাথে ভালো ব্যবহার টাও করতে পারি না। তোমাকে মাফ করতে পারিনি কখনো। মজুফুপুর জন্য, মায়ের জন্য।
আমি আজ ঠিক করে বলতে পারব না, ঠিক কোন সময় থেকে তুমি এতো বিরাগভাজন হয়েছিলে আমার কাছে। তবে মজুফুপুর অবদান আছে সবচেয়ে বেশি, তা আজ বুঝতে পারছি।
তবে বাবা, উনাকে দোষ দেব কিভাবে! তুমি তো পরে জেনেছিলে সবই। সব জেনে শুনেই ফুপাও বিয়ে করল উনাকে। শুধু মেয়েরা মমতাময়ী, সর্বংসহা হয় না, এই তোমাদের মতো পুরুষ রাও হয়।
আমি যদি শুরুতেই তোমার সাথে সব শেয়ার করতাম তবে হয়তো সারাজীবন এতো দূরে থাকতাম না।হয়তো আমি আমার ভুল পরিচিতি জেনে পার করতাম না এতোগুলা বছর। হয়তো তোমরা শুরুতেই জানতে পারতে মজুফুপু সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত। উনি যা বলেন তার বেশির ভাগই মস্তিষ্কজাত,বাস্তবের সাথে কোনো মিল নেই তার।
বাবা, আজ সত্যিই সেই না-মুমকিন স্বপ্ন সত্যি করতে ইচ্ছা করছে। তোমাকে আবার কাছে পেতে ইচ্ছা করছে। সেই বয়সটা ফিরে পেতে ইচ্ছা করছে, যখন আমার অধিকারী কেবলমাত্র তুমি ছিলে। যখন
তুমি হাসপাতাল থেকে ফিরতেই আমি দৌড়ে গিয়ে তোমার কোলে চড়তাম। অনেক বায়না করতাম,আর তুমি সেসব মানতেও। আমার কাঁচা হাতের লেখা গুলো এখনো আছে দেয়ালে ফ্রেম করে টানানো। তোমার এই আদরের মেয়ের একটা ফেলনা জিনিসও তুমি ফেলে দাও নি। অথচ তোমার মেয়েটা তোমার সবচেয়ে দামী জিনিসটাই ফেলে দিয়েছে,তোমার স্নেহ, আদর, ভালোবাসা। কত বছর তুমি হাতে তুলে খাইয়ে দাও নি। কত বছর তোমার বুকে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমাই নি। কত বছর তোমার আদরকে ফিরিয়ে দিয়েছি। তুমি কত অভিমান নিয়ে চলে গেলে। আর কত দোয়া রেখে গেছ, তা শুধু তুমিই জানো, বাবা। শুধুমাত্র সেসবের জন্যই হয়তো আমি আজ অনেক সুখে আছি।
দশ বছর হলো মজুফুপু দেশের বাইরে। বাবা, তোমার ডায়েরি না পেলে জানতামই না কেন। ফুপাকে ভুল বুঝেছি অনেক সময়।
আজ এতোবছর পরে সব কিছুই এতো পরিষ্কার ভাবে চোখের সামনে দেখে কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে। অশ্রু বাঁধ মানছে না আর। যদি আর একটা বার তোমাকে ছুঁতে পারতাম। আর একটা বার শুধু ভালোবাসা নিয়ে জড়িয়ে ধরার সুযোগ পেতাম!
আর একটা বার আমায় “শারদসংহার শাশ্বতী ” বলে ডাকতে! এবার বিরক্ত হতাম না, চেঁচামেচি করতাম না বাবা। এই অর্থহীন নামটাই এখন সবচেয়ে অর্থবহ মনে হচ্ছে।
যে দুনিয়াতেই থাকো, ভালো থেকো, মায়ের সাথে।
ভালোবাসা রইল বাবা।
ইতি,
তোমার শাশ্বতী

শাশ্বতী খেয়াল করেনি, তার চার বছরের মেয়ে আহির একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখছে, তার মা কাঁদছে। কাছে যাবার ভরসা পাচ্ছে না সে। মাকে এমন ভাবে দেখে নি আগে।
তার মনটাও বিষন্ন হয়ে উঠছে। এক দৌড়ে চলে গেল বাড়ির ভেতর। বাবার গলা জড়িয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ওর বাবা, আসিফ,ঠিক শাশ্বতীর বাবার মতো করেই মেয়েকে কোলে করে শান্ত করার চেষ্টা করছিল।
শাশ্বতীর মনে হল পৃথিবীর সব মেয়ের বাবাই একই রকম। স্নেহের অসীম ভাণ্ডার।কেউ আলাদা নয়।
(সমাপ্ত)

By | 2018-07-25T14:12:15+00:00 July 25th, 2018|ছোট গল্প|0 Comments

About the Author:

Leave A Comment

error: Content is protected !!