ভালবাসার রং – মামুন হাসান

Home/ছোট গল্প/ভালবাসার রং – মামুন হাসান

ভালবাসার রং – মামুন হাসান

ছেলেটি গার্মেন্টসে চাকরি করতো, মেশিন ম্যান পদে।
ওভারটাইম করেও সংসার চালানো দায়। বাবার ওষুধ, ছোট ছোট ভাই বোনের লেখাপড়া তার পর সংসারের খরচ, সব মিলিয়ে চোখে প্রায় অন্ধকার দেখা। তার পরও মুখে হাসিটা ঝুলিয়ে রাখাটা যেন অভ্যাস হয়ে গেছে।
সামনের মাসেই মেয়েটির জন্মদিন, মেয়েটি ছেলেটির সাথে একই পদে চাকরী করতো। নিম্নবিত্ত বলে গার্মেন্টসে চাকরি করা, বাবা যদি পয়সাওয়ালা হত তবে নিশ্চয়ই কোন সাবান কোম্পানীর সুন্দরী প্রতিযোগীতায় প্রথম হত, এতে কোন সন্দেহ নেই।
ছেলেটি মনে মনে প্রচন্ড রকম ভালোবাসতো মেয়েটিকে, কিন্তু প্রকাশ করার সাহস পাচ্ছিলো না।
প্রতিদিন দুপুরে একই সাথে টিফিন করতো দুজন। তরকারি বিনিময় করে খাওয়া ছিল রোজকার সাধারণ একটা ব্যাপার।
বেশ কিছুদিন ধরে ছেলেটি একা একা টিফিন খেত নির্জন কোন স্থানে। কিছুদিনের ভিতর ব্যাপারটা সবার নজরে পড়ে, বিশেষ করে মেয়েটির।
মেয়েটি এমন ব্যবহারে কষ্ট পেলেও কিছু বলতো না, বলার মত কোন অধিকার ছিল না হয়তো, তবে মেয়েটি কিছু বলার মত অধিকার হয়তো চেয়েছিলো।
এক সময় একা টিফিন করাটা প্রায় সবারই নজরে পড়ে যায়। সবাই আড়ালে বলাবলি করতো ” বেশ ভাল কামাচ্ছে তো, তাই প্রতিদিন টিফিনে মাছ, মাংস থাকে, আলু ছানার বা ডালের সাথে যায় না বলেই আড়ালে খাওয়া।
কিন্তু মেয়েটি মানতে পারছিলো না, তার কেমন যেন সন্দেহ হত কিছু একটা সমস্যা আছে,মুখে বলার মত অধিকার না থাকার কারনে মুখ বুজে থাকতে হত।
এভাবে পার হল বেশ কিছুদিন, আর মাত্র দুদিন পরেই মেয়েটির জন্মদিন।
আজ সবাই মিলে একত্র হয়েছে, কিছু একটা করতেই হবে। কিছু টাকা হয়েছে বলে এত অহঙ্কার? সমুচিত জবাব না দিলে যেন আর চলছে না।
রোজকার মত ছেলেটি টিফিন ক্যারিয়ারটা হাতে নিয়ে যাচ্ছিলো নির্দিষ্ট স্থানে। তবে সবার বাধার মুখে ছেলেটির আর যাওয়া হল না। টিফিন ক্যারিয়ারের ভিতরের পোলাউ মাংস দেখার জন্য সবাই টানা হ্যাচরা শুরু করলো, ” দয়া কর তোমরা, বাটিটা ফিরিয়ে দাও ” বলে কান্নারত কন্ঠটা কারো কান পর্যন্ত পৌঁছালোনা।
টানাটানির এক পর্যায়ে ক্যারিয়ারটা মেঝেতে পড়ে গিয়ে সব বাটি গুলোর ঢাকনা খুলে গিয়ে ভিতরের সব রহস্যর সমাধান হয়ে গেল।
সম্পূর্ন ফাঁকা ছিল প্রতিটা বাটি।
ছেলেটি রোজ টিফিনের খরচ বাঁচিয়ে টাকা জমাচ্ছিলো মেয়েটির জন্য এক জোড়া রুপার নূপুর বানাবে বলে।
জন্মদিনে মেয়েটির হাতে দিয়ে বলবে “তোমায় বড্ড ভালবেসে ফেলেছি”।
পিনপতন নিরবতা ভেঙে চাপের মুখে সব বলতে বাধ্য হল ছেলেটি।
সহকর্মীর জন্য সবাই আজ গর্বিত, ভালবাসা শুধু পয়সাওয়ালাদের মধ্য সীমাবদ্ধ না, তাদের মত নিম্নবিত্ত মানুষেরাও ভালবাসতে পারে। পার্থক্য শুধু নিম্নবিত্তের ভালবাসা কখনও ইতিহাস হয় না।
মেয়েটির চোখের জল কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছে বিধাতাকে এমন নিস্পাপ ভালবাসার জন্য।

By | 2018-04-18T13:39:31+00:00 April 18th, 2018|ছোট গল্প|0 Comments

About the Author:

Leave A Comment

error: Content is protected !!