বুমেরাং – তওহিদ মাহমুদ হোসেন

Home/ছোট গল্প/বুমেরাং – তওহিদ মাহমুদ হোসেন

বুমেরাং – তওহিদ মাহমুদ হোসেন

থ্রিলার গল্পঃ

সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেললাম।
গত একমাস ধরে স্বস্তি পাচ্ছিলাম না মোটেই। কি কাজ, কি অবসর, খাওয়া কিংবা ঘুমানো – সারাক্ষনই মাথার মধ্যে চিন্তাটা ঘ্যানঘ্যান করে ঘুরছিল। ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করেও লাভ হয়নি কোন। অবশেষে আজ সকালে প্রথম কাপ শেষ করে যখন দ্বিতীয় কাপের অপেক্ষায় বসে আছি ঠিক তখনই হঠাৎ মনটা স্থির করে ফেললাম।
রিমিকে খুন করব আমি। ডিসিশন ফাইন্যাল।
ভাবছেন এত মারাত্মক একটা সিদ্ধান্ত কেন নিলাম? হুম…সে কথাটা এই মুহূর্তে বোঝানো বেশ জটিল। তারওপর রিমি আর আমাকে যদি চিনে থাকেন তাহলে তো আরও আশ্চর্য হবেন। কিন্তু বিশ্বাস করুনঃ আমার কোন উপায় নেই। আমার জায়গায় থাকলে আপনিও একই পথ বেছে নিতেন। যে ফাঁদে আষ্টেপিষ্ঠে আমি জড়িয়ে গিয়েছি তার থেকে মুক্তির পথ এই একটাই। আমাকে যদি বাঁচতে হয় তাহলে রিমিকে মরতেই হবে।
উঁহু…রিমি দেখতে কুৎসিত কিংবা বিকলাঙ্গ নয়। রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে দশ জনের মধ্যে আট জনই ঘুরে তাকাবে। চোখ ধাঁধানো মাদকতা নয়, বরং ওর সৌন্দর্য স্নিগ্ধ। তাহলে কি চরিত্রহীনা? সেটাও নয়। রিমি আমাকে ছাড়া কিছুই বোঝে না। পতিঅন্তপ্রাণ যাকে বলে আর কি। আজ পাঁচ বছর হলো আমাদের বিবাহিত জীবন। এরমধ্যে একদিনও সে আমাকে ছেড়ে থাকেনি। এমনকি বিয়ের আগে যে দু’চার জনের সাথে বন্ধুত্ব ছিল, বিয়ের পর সবার সাথেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে। ওর মত সাংসারিক মেয়েকেই লোকে কল্পনা করে। আমাদের ছোট্ট সংসারটিকে আলো ঝলমল করে রাখার চেষ্টার কোন ত্রুটিই পাওয়া যাবে না রিমির মধ্যে। অর্থাৎ আমি বোঝাতে চাইছি আদর্শ স্ত্রী বলতে যা বোঝায়, রিমি হলো তার চলমান প্যাকেজ। ঝগড়া তো দূরের কথা, মতদ্বৈততা যে কি জিনিস তা আজ অব্দি আমি টের পেলাম না। বন্ধুবান্ধব আর কলিগরা যারা আমার বাসায় এসেছে তারা তো আমার স্ত্রীভাগ্য দেখে অসম্ভব ঈর্ষান্বিত।
ঠিক এটাই রিমিকে খুন করার অন্যতম কারন। আমার জীবনটা একঘেয়ে হয়ে গিয়েছে রিমিকে বিয়ে করার পর। নাহ…আমাদের প্রেমের বিয়ে নয়। আমার একমাত্র মামার কলিগ ছিল রিমির দূর সম্পর্কের খালু। সেই যোগাযোগেই বিয়ে। সেই থেকে আমি সংসার করছি যেন এক পুতুলের সাথে যে কিনা আমার ইচ্ছেগুলোরই প্রতিফলন। কোনকিছুতেই রিমির নিজস্ব ইচ্ছে বলে কিছুই জানতে পারলাম আজ পর্যন্ত। আমি বললে অবশ্যই যাবে, কিন্তু নিজ থেকে কোনদিন বলবে না, ‘চলো না, আজ রিকশা করে ঘুরে আসি।’ অথবা ‘সিনেমায় যাই, চলো।’ এই একান্ত রকমই বাধ্য স্ত্রী নিয়ে আমার জীবনে কোন উচ্ছাস বা উত্তেজনা নেই। সবসময় যদি কেউ আপনাকে ভক্তিভরে পুজা করতে চায় এবং সেটা যদি চব্বিশ ঘন্টাই হয়, তাহলে দৈনন্দিন জীবন যে কি ভীষন একঘেয়ে হয়ে যায় সেটা বোঝানো খুব কঠিন। আমি ঠিক সেই ফাঁদে পড়েছি এবং টের পেয়েছি মৃত্যু ছাড়া এর থেকে মুক্তি নেই।
তা-ও হয়তো রিমির সাথে জীবনটা টেনে নিয়ে যেতে পারতাম যদি না আমার পরিচয় হতো বুবলির সাথে। বুবলি – রিমির দূর সম্পর্কের চাচাতো বোন। আমাদের বিয়ের সময় ছোট ছিল। তাই দেখে থাকলেও আমার নজর কাড়েনি। কিন্তু মাস ছয়েক আগে যখন হঠাৎ করে বুবলি ওর বোনের বাড়ি বেড়াতে এলো তখন আমার মাথাটাই যেন এলোমেলো হয়ে গেল। বুবলি হলো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ঝড়। রিমি যদি নদী হয় তো বুবলি হলো প্রমত্ত সমুদ্র। রিমি যদি স্নিগ্ধ চাঁদ হয় তাহলে বুবলিকে বলতে হবে প্রাণস্পন্দনে টগবগ করতে থাকা সূর্য। তাই বুবলি শুধুই চুম্বকের মতো অমোঘ আকর্ষনে আমায় টানতে থাকল অহর্নিশ। বোনকে এতকাল বাদে কাছে পেয়ে রিমি মহা খুশি। এমনই সরল মেয়ে যে নির্দ্বিধায় আমার সাথে বুবলিকে ছেড়ে দিয়ে বলে ঢাকার দ্রষ্টব্য স্থানগুলো দেখিয়ে আনতে। আমরা দিনের পর দিন ঘুরে বেড়াতে লাগলাম শহীদ মিনার, লালবাগ কেল্লা আর বোট্যানিক্যাল গার্ডেনে। আর অনিবার্যভাবেই ঘনিষ্ঠতা শালী-দুলাভাইয়ের স্বাভাবিক সম্পর্কের সীমানা ছাড়াতে লাগল। অবশ্য আমার উদ্যোগই ৮০ শতাংশ। বুঝতাম বুবলি ওর বোনের কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছে না। এদিকে আমি যে পাগলামির শেষ প্রান্তে চলে যাচ্ছি আস্তে আস্তে। তাই মাস দু’য়েক আগে একদিন বুবলিকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসলাম।
কিন্তু বুবলি রাজি না। সে কোনকিছুর বিনিময়েই বোনের সুখের সংসার ভাঙ্গতে দেবে না। তাই সে আমাকে পরিষ্কার করে বলে দিল যেন এইসব পাগলামো মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলি আর রিমিকে নিয়ে সুখের এই সংসার চালিয়ে যাই। কিন্তু আমি কি করে বোজগাই যে আমি রিমির হাত থেকে মুক্তি চাই। আর সেই সাথে চাই বুবলিকে নিয়ে ঘর বাঁধতে। শেষ পর্যন্ত বুবলি সিদ্ধান্ত নিল ও হোস্টেলে চলে যাবে। আমার চোখের সামনে থাকবে না। আর ঠিক তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম – রিমিকে আমি খুন করব। রিমি না থাকলে বুবলি একদিন না একদিন আমার হবেই।
খুনটা করতে হবে এমনভাবে যেন সবাই একে দুর্ঘটনা মনে করে। তাই প্ল্যানটা হতে হবে সহজ এবং ফুলপ্রুফ।
যখন আমি চায়ে চুমুক দিতে দিতে তন্ময় হয়ে এইসব ভাবছি তখন হঠাৎ রিমির ডাকে চমক ভাঙ্গল। তাকিয়ে দেখি ওর হাতে আমাদের বিয়ের সময়কার ইস্ত্রিটা। আবার শর্টসার্কিট হয়ে গিয়েছে। ইস্ত্রি দেখেই আমার মাথায় বিদ্যুৎচমকের মতো প্ল্যানটা চলে এলো। ইস্ত্রিটা বেশ পুরোনো। মাঝে মাঝেই শর্ট সার্কিট হয়ে যায়। তখন আবার মিস্ত্রিকে দিয়ে ঠিক করিয়ে নেই। যখন শর্টসার্কিট হয় তখন একটা লাল আলো জ্বলে ওঠে। তো আমাকে যা করতে হবে সেটা হলো ইস্ত্রিটা শর্ট করে রেখে আলোটা নিভিয়ে রাখতে হবে। তারপর এমন ব্যবস্থা করতে হবে যেন রিমি ওই অবস্থায় ইস্ত্রিটা ব্যবহার করে। এটাও খুব সহজ। আমি অফিসে গিয়ে ওকে ফোন করে বলব বিশেষ একটা শার্ট ইস্ত্রি করতে। তারপর যখন প্লাগটা কানেক্ট করে রিমি ইস্ত্রিটা ধরবে তখনই কেল্লা ফতে।
কিন্তু বুবলিকেও বোঝাতে হবে যে আমি রিমির সাথে আবার মিলে গিয়েছি। সুতরাং একমাস ধরে মাঝে মাঝেই আমরা তিনজন বেড়ানোর প্রোগ্র্যািম করতে থাকলাম। প্রতি ছুটির দিন হয় সিনেমায় না হলে কোন জায়গায় বেড়াতে যেতাম আমরা তিনজন। প্রথম প্রথম বুবলি আড়ষ্ঠ থাকত। কিন্তু আমার পক্ষ থেকে কোন চেষ্টা না দেখে সে একসময় আস্বস্থ হলো যে আমার মাথা থেকে ভুত নেমে গিয়েছে। আমাদের প্রতিটা প্রোগ্রাম শেষ হতো চমৎকার কোন রেস্টুর্যাান্টে ডিনার দিয়ে। তারপর আমি আর রিমি বুবলিকে ওর হোস্টেলে নামিয়ে বাড়ি ফিরতাম। এমনকি বহুদিন পরে আমি আবারও রিমিকে বিশেষ আদর করা শুরু করলাম। রিমির বিষ্ময় চরম আনন্দে পরিনত হলো। আমি জানি আমার এই নতুন করে ফিরে পাওয়া রূপ ও বুবলি আর বান্ধবীদের কাছে গল্প করবে। এটাই পরে আমার পক্ষ্যে সাক্ষ্য দেবে যে আমি বউকে কতটা তীব্র ভাবে চাইতাম। দেখা গেল আমার ধারনা সঠিক। রিমি খুব খুশি আমাকে এভাবে ফিরে পেয়ে আর জানিয়েছেও সবাইকে।
আজকেই সেই বিশেষ দিন। আজকের পর থেকে আমি মুক্ত। গতকালই ইস্ত্রির ওপর কারিগরি ফলিয়েছি। কারও বাপের সাধ্য নেই যে ধরে এটা ইচ্ছে করে করা হয়েছে। সকালে অন্যান্য দিনের মতোই রিমিকে চুমু খেয়ে অফিসে বেরিয়ে গেলাম। একটা পর্যন্ত কাজও করলাম ঠিকমত। তারপর ধীরেসুস্থে লাঞ্চ করে ফোন করলাম রিমিকে। বললাম, বুবলিকে নিয়ে আজ বাইরে খাব আমরা। ও যেন বুবলির সাথে কথা বলে ঠিক করে। কিছুক্ষন পর রিমি ফোন করে জানালো যে বুবলি সন্ধ্যায় চলে আসবে আমাদের বাসায়। একসাথেই তিনজন যাব। এবার আমার কাজে নামার পালা। ঠিক সাড়ে তিনটায় ফোন করলাম করলাম আবার রিমিকে। বললাম গতমাসে আমাদের এনিভার্সারিতে যে হালকা খয়েরি শার্টটা রিমি আমাকে গিফট করেছিল সেটা যেন ইস্ত্রি করে রাখে। ও-ও যেন আমার দেওয়া কাঞ্জিভরম শাড়িটা পরে। আমি চাইছিলাম বুবলি আসার আগেই যেন ঘটনা ঘটে যায়। আমি ফোন করব সাড়ে চারটার দিকে। তারপর বুবলিকে জানাবো যে রিমির কোন সাড়া পাচ্ছি না। আমার পাশের ফ্ল্যাটের করিম সাহেবের বউকও জানাবো। এই দুজন দরজা ভাঙ্গার চেষ্টা করার আগেই আমি পৌঁছে যাব বাড়িতে। তারপর তো সবার সামনেই প্রকাশিত হবে সেই ‘মর্মান্তিক ঘটনা’। কেউ আমার টিকিটিও ছুঁতে পারবে না।
ঘড়ির কাঁটা যেন নড়তেই চাইছে না। আমি বারবার হাঁটাহাঁটি করছি অস্থিরতা কাটানোর জন্য। অবশেষে সাড়ে চারটার কাঁটা ছুঁতেই আমি ফোন তুলে নিলাম। প্রথমে রিমিকে ফোন করতে হবে যেন আমার আউটগোয়িং কলে নম্বর আর সময়টা উঠে থাকে। ফোন ডায়াল করতে যাব এমন সময় ডিসপ্লেতে একটা নাম জ্বলজ্বল করে উঠে আমাকে স্তম্ভিত করে দিল। রিমি – রিমি ফোন করেছে। তার মানে আমার প্ল্যান কাজ করেনি। অসম্ভব! অসম্ভব! কাঁপা কাঁপা হাতে আমি কলটা রিসিভ করতেই বজ্রপাতের মত রিমির কান্নাব্যাকুল কন্ঠ চিরে শব্দগুলো বেরিয়ে এলোঃ
‘জামিল…জামিল…কি হয়ে গেল। জামিল কি হয়ে গেল…।” রিমির কন্ঠ রোধ হয়ে আসে।
আমি চরম আতংকে ততক্ষনে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছি, ‘কি হয়েছে..?? কি হয়েছে বলো আমাকে।’
‘তুমি তোমার শার্ট ইস্ত্রি করতে বলেছিলে। আমি সব বের করেছিলাম। এমন সময় বুবলি এলো হঠাৎ। আমি কি মনে করে ওকে বললাম শার্ট ইস্ত্রি করতে। আমি এই ফাঁকে ঘরটা গুছিয়ে ফেলতে চেয়েছিলাম। আমি ড্রয়িং রুমে। এমন সময় বুবলির একটা চিৎকার শুনে গিয়ে দেখি বুবলি মাটিতে পড়ে আছে আর মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা বের হচ্ছে। বুঝলাম ও শক খেয়েছে।’ রিমি প্রাণফাটা স্বরে কথাগুলো বলল।
‘তারপর..? বুবলি কেমন আছে? বল বুবলি কেমন আছে?’ কি এক অশুভ আশংকায় আমার সারা শরীর কাঁপছে তখন। রিমির শেষ কথাগুলো আমার মস্তিষ্কে বাড়ি মেরে হাত থেকে ফোন ফেলে দিলঃ
‘বুবলি আর নেই জামিল। বুবলি নেই।’
(সমাপ্ত)

By | 2018-06-14T20:59:13+00:00 June 14th, 2018|ছোট গল্প|0 Comments

About the Author:

Leave A Comment

error: Content is protected !!