বাংলা প্রহসন – হাবিবা সরকার হিলা

Home/প্রবন্ধ/প্রবন্ধ/বাংলা প্রহসন – হাবিবা সরকার হিলা

বাংলা প্রহসন – হাবিবা সরকার হিলা

গোল্ডেন এপ্লাসের বাংলা কি?
আমি সঠিক জানি না। কেউ জানলে জানাবেন। সেদিন কৌতুহলবশত দুটোয় জিপিএ-৫ পাওয়া এক ছোট ভাইয়ের ফেসবুক আইডি ঘাটছিলাম। বিভিন্ন স্ট্যাটাসে বাংলা বানান চোখে পড়ল। লক্ষ্যকে লিখেছে লক্ষ স্বপ্নকে সপ্ন। না ভাই,আমি ছেলেটাকে দোষ দিচ্ছি না। প্রাইমারীতে পড়ার সময় এছেলেটা যখন গুটি গুটি পায়ে মার্কশীট নিয়ে আসতো,
বাবা জিজ্ঞেস করতো কত?
-অঙ্কে কত পেয়েছিস?
মা বলত,
-বাবা, ইংরেজীতে কত?
ঠিক এসময়টাতে আমাদের মগজে ঢুকিয়ে দেয়া হয় তোমাকে ইংরেজী গণিতে পাকা হতে হবে । হ্যাঁ অবশ্যই শুধু ইংরেজী এবং গণিতে।গন্ডায় গন্ডায় প্রাইভেট টিউটর ঠিক করে দেয়া হবে। মায়েরা ভাতের থালা হাতে নিয়ে এক নলা ভাত ছেলের মুখে তুলে দিয়ে বলবে,
-বলো,I eat rice মানে আমি ভাত খাই।
দু’চারটা বাংলা কবিতা তবুও এক সময়ের জেনারেশন মুখস্থ বলতে পারত। সৃজনশীলের বদৌলতে মুখস্থ করার চল উঠে গেছে।এখন শুধু পৃষ্ঠা ভর্তি বাংলা লিখলেই বাংলা পরীক্ষায় মার্ক পাওয়া যায়। বাংলা শিক্ষকেরা বোর্ডের এত হাজার হাজার খাতার কয়টা খাতার দু’চার পৃষ্ঠা পড়ে থাকেন আল্লাহ মালুম। ব্যাকরণে, বানানে, হস্তাক্ষরের ভুল তাদের চোখে পড়ে না। এস.এস.সি ও এইচ.এস.সি লেভেলে একটাই বই মুনীর চৌধুরীর ব্যাকরণ বইটা পড়ানো হয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, চার বছর একটা বই পড়ার পরও আমরা সমাসের কথা শুনলে চোখ কপালে তুলি। বাঙালির ছেলে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা প্যাসেজ ন্যারেশন চেঞ্জ করতে পারে। উক্তি পরিবর্তন কাকে বলে জানে না।

এতো গেল লেখালেখির ব্যাপারটা। ভাই, আপনি আমি কথা বলার সময় অভ্যাসবশত দু’চারটা ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করব এতে দোষের কিছু নেই। এমন কিছু শব্দ আছে যেগুলোকে আলাদা করে আর ইংরেজী শব্দ মনে হয় না। সমস্যাটা হচ্ছে প্রয়োগে। একজন ব্রিটিশ লোক যখন স্যরি বলে, তখন বুঝতে হবে তিনি তার করা কাজটার জন্য লজ্জিত এবং তিনি কাজটা আর করবেন না। আপনি আমি কাউকে স্যরি বলা মানে আকাম কুকাম করতে গিয়ে ধরা পরে গেছি। তাই দোষ ঢাকতে স্যরি বলছি । প্রয়োজন বিশেষে একাজ আমার দ্বারা আবার করা হবে।
যদি এমন হত আমরা বাংলা শব্দ হাতড়ে না পেয়ে ইংরেজী শব্দ ব্যবহার করতাম তবে একটা কথা ছিল। হাতের কাছে রূপবতী,সুন্দরী, মায়াবতী, মোহময়ী শব্দগুলো থাকতেও আমরা কিউট,সুইট,লাভলি বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। আমাদের আর কাউকে ভালো লাগে না আমরা শুধু দফায় দফায় ক্রাশ খাই ।

নোয়াখালীর টান, সিলেটি টান, ময়মনসিংহেরর টান দেখে আমরা বুঝতে চেষ্টা করতাম, বেটা কোন এলাকার মানুষ। আজকাল সবাই বাংলিশ ভাষায় কথা বলি। টান দিব? ওয়াক! থু! লোকে আমাদের ক্ষেত ভাববে না! জ্বী ভাই, আমরা অবশ্যই বাঙালি। ২১ শে ফেব্রুয়ারি ভোরে খালি পায়ে ফুল দিতে যাই, ভাষা দিবস উপলক্ষ্যে নানা সেমিনার, আলোচনা সভা, প্রতিযোগিতার আয়োজন করি। ফেসবুকে ইয়াবড় স্ট্যাটাস দেই। আজিব, লুল ইত্যাদি বিকৃত শব্দ ব্যবহার করে আমরা নিজেদের আধুনিক প্রমান করার চেষ্টা করি।

একুশে ফেব্রুয়ারি এলে আমরা স্মরণ করি বরকত, জব্বার, সালাম আরো নাম না জানা ভাষা শহীদদের কথা। আমরা কি জানি সারা ফাল্গুন মাসব্যাপী অনেক শিক্ষার্থী খালি পায়ে ঘুরে বেড়াত। মেয়েরা কালো শাড়িতে নিজেদের মুড়িয়ে রাখত। তখনও ভাষা দিবস শোকদিবস বা আন্তজার্তিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি পায় নি। আমরা ভুলে গেছি সেইসব ভাষা সৈনিকদের কথা যারা বার বার ভাঙা শহীদ মিনার শতবার গড়েও ক্লান্তবোধ করত না ।

ভাষার ব্যবহারটা ঠিক এন্ট্রপির মত। সময়ের সাথে সাথে এন্ট্রপি বৃদ্ধি পাবে। আপনি, আমি যতই ভাষা নিয়ে যতই বড় বড় ভাষণ দেই না কেন ভাষা তার নিজস্ব নিয়মে পরিবর্তনশীল।ইংরেজি, হিন্দি শব্দ বাংলা ভাষায় যোগ হচ্ছে আর হতেই থাকবে। শুধু আমরা যেন স্পষ্ট ভাষায় বাংলা বলতে জানি। আমি নেত্রকোনার টানে কথা বলি এযেন আমার লজ্জা নয় অহংকার হয়ে দাঁড়ায়।

নিজের পরিবারের কাউকে আপনি বকতে পারেন, মারতে পারেন প্রয়োজনে গালিগালাজ করতে পারেন। ভিন্ন পরিবার থেকে আগত কেউ যদি আপনার পরিবারে এসে কর্তৃত্ব ফলায়, কারো গায়ে আঘাত করে আপনি কি তা মেনে নিতে পারবেন? ভাষার ব্যবহারটা ঠিক এমনি। মারো,কাটো আর যাই করো দিনশেষে আমার মায়ের ভাষা বাংলা। আমার পরিবারের সবচেয়ে আপনজন।

“আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি” এ গানটার মত আর কোনো গান আছে কি যা বাঙালির প্রতিটা লোমকূপ শিহরিত করে তোলে?ঠিক এমনি সুরে এক একটা বাংলা শব্দ নিজ মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে প্রতিটা বাঙালির কন্ঠে প্রাণের ভাষা হয়ে ঝড়ে পড়ুক।

By | 2018-05-09T15:16:13+00:00 May 9th, 2018|প্রবন্ধ|0 Comments

About the Author:

Leave A Comment

error: Content is protected !!