ফিরতি বিকেলের উল্লাস – রওশন রুবী

Home/ছোট গল্প/ফিরতি বিকেলের উল্লাস – রওশন রুবী

ফিরতি বিকেলের উল্লাস – রওশন রুবী

গালে কাঁচাপাকা দাড়ির ভেতরে মসৃণ ত্বক উঁকি দিচ্ছে যেটুকু; তাতে বয়সের ছাপ সেভাবে না পড়লেও এখন চিন্তিত তোহির সাহেব। গায়ে বেগুনির উপর ছোট ছোট সাদা বলের ফুল হাতার শার্ট। পরনে কালো প্যান্টের সাথে কাঁঠালি রঙের পাম-সু। হাতে ঘড়ি পরেন না কখনোই তিনি। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। পেছনে এনজিও অফিসের গাড়িগুলো এলোমেলো ভাবে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায়। পথের পর পথ পেছনে রেখে, বলেশ্বর ব্রিজের উপর হিরো গ্লামার বাইকটা থামালেন ৫.৭ ইঞ্চি লম্বা তোহির সাহেব। বাইকের উপর আড়াআড়ি বসে নির্লিপ্ত চেয়ে রইলেন পিরোজপুর সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয়ের দিকে। গেইটের ভেতরে স্কুলটির হলুদ রঙ যেন তার মতোই বিবর্ণ। মনের কোঠরে আঁচড় কাটে হাজার লক্ষ কথা। সে সময় ঢং ঢং ঘন্টা বাজে স্কুলের ভেতরে। তিনি মোবাইল বের করে সময় দেখলেন। চতুর্থ পিরিয়ডের সময় এখন। ঠিক এই সময়টা ছিল স্বপ্নের পঙ্খীরাজ প্রাপ্তির মত তোহির সাহেবের। তিন ভাই; দাদা দাদি ফুফুকে নিয়ে ছিল তাদের বাবাহীন টানাপোড়েনের সংসার। বাবা পিরোজপুর পোস্ট অফিসে চাকরি করতেন। যখন তোহির সাহেবেব বয়স ছ‘বছর; তখন তিনি জন্ডিসে আক্রন্ত হয়ে মারা যান। মা জোবেদা খাতুন ভীষণ হিমসীমে পড়েন সংসার চালাতে। আবাদী জমি-জমাও তেমন ছিল না তাদের। জোবেদা খাতুন গুণটানার মত সংসারটা টেনে টেনে নিয়ে এসেছেন আলোর রেখাপাত দেখা পর্যন্ত। মামারা মাঝে মধ্যে কিছু হেল্প করে যেতেন। অভাবের বিশাল সাগরে দুফোঁটা মমতা; মায়ের চোখগুলোকে আনন্দে ভরিয়ে দিত। তিনি ছিলেন খোদা ভক্ত, সরল, শান্তি প্রিয় মানুষ। খুব অল্পতেই তুষ্ট হতেন। মা কখনও কখনও স্কুলে আসবার সময় ভাত হতে দেরি হলে চুলার উপর থেকেই মাড়ে ভাতে বেড়ে দিতেন তোহির সাহেবকে। সাথে হয়ত হলুদ লবণ দিয়ে গরম করে রাখা ইলিশ মাছের পেটি বা শুটকির ভর্তা, শুকনা মরিচ বাটা ইত্যাদি। মায়ের হাতের সেই খাবার এখনও জীভে লেগে আছে অমৃতের স্বাদ নিয়ে। ঐ অতটুকু খাবার খেয়ে সারাদিন থাকতে হতো। কোন কোন সময় না খেয়েই আসতে হতো। সে সময় স্কুলে টিফিন আনা বা দেয়ার প্রচলনই ছিল না। তোহির সাহেবও কখনও টিফিন আনতেন না। আনতো না স্কুলের কেউই। তাই তেতে উঠা ক্ষুধার সামনে চতুর্থ পিরিয়ডের টিফিনের সময় জীভে জল চলে আসতো তোহির সাহেবের। তোহির সাহেবের সহপাঠী ছিলেন সান্তানু। সে বদমেজাজি ছিল। একবার কাগজের দিস্তা ভাগাভাগি নিয়ে তার বোনকে পিটিয়ে নাক ফাটিয়ে দিয়েছিল। সেবার তাকে দুদিন ঘরে জায়গা দেয়নি কাকিমা। পিরোজপুর স্কুলে তার দাপট ছিল অন্যদের তুলনায় বেশি। আবার স্যারদেরকে যেভাবে মান্য করতো; মনে হতো, তার মত অমন শান্ত, নম্র ছেলে দুটো খুঁজে পাওয়া মুশকিল। তাই স্যারেরা তাকে চোখে হারাতো। ছোট ভাইয়েরা দু‘একটা চড় থাপ্পড় খেয়ে বিচার নিয়ে এলেও হিতে বিপরীত হতো। স্যারদের এমন প্রশ্রয়ের কারণে ও ডোন্টকেয়ার ভাবে চলা ফেরা করত। টানা পাঁচ বছর পর্যন্ত ক্লাস ক্যাপটেন ছিল সে। চতুর্থ পিরিয়ডের পরে টিনের বালতি নিয়ে হাজির হতো। হাজিরার সংখ্যা অনুযায়ী জোড়া সন্দেশ, সমুচা, নিমকি, কদাচিৎ হক বিস্কিট হাতে হাতে তুলে দিত সে ছাত্রছাত্রীদেরকে। তখন সান্তানুকে তোহির সাহেবের মনে হতো ও কতো ভাগ্যবান। সব খাবারের দায়িত্ব সে পেয়েছে। যদি এ দায়িত্বটুকু তিনি পেতেন? কদাচিৎ একটা দুটো অতিরিক্ত থাকলে তার প্রিয় ক্লাসমেট অনিককে দিতেন তিনি। একথা অবশ্যই স্যারেরা জানতো না। নিজের ক্ষমতা বলেই দিত। সেই অনিক এখন নেই এদেশে, কলকাতায় বসবাস করছে। মাঝে মধ্যে বাপ দাদার ভিটে দেখতে এলেও কোন সহপাঠি বা সান্তানুর সাথে দেখা করে না। সান্তানু দুঃখ পায়। একদিন সে তোহির সাহেবকে বলেছিলেন। অনিক পুরোপুরি বদলে গেছে। ও মনে রাখেনি আমাদেরকে। কখনও সখনও ফোন করলে দু একটা কাট কাট কথা বলে। দূরত্বটা সত্যি জৈবিক তাড়নায় হয়ে উঠে। পৃথিবী অদ্ভুত এক ঘোরের কারখানা।
শামিম আহসান নামে আরেক সহপাঠী ছিলেন তোহির সাহেবের। সে আর তোহির সাহেব ছিলেন একে অন্যের প্রাণ। বনে বাদাড়ে ঘুরে পাখির বাসা থেকে বাচ্চা বা ডিম চুরি করতেন। কখনও বন্যফল পেড়ে খেতেন। কখনও ঝিলেবিলে তারা মাছ ধরে বেড়াতো। ও এখন বড় চাকরি করে। সৌদি বাংলাদেশ হাই কমিশন কনসাল জেনারেল ছিলেন। কিছুদিন হলো রাষ্ট্রদূত হয়ে গেছেন। অনেক যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায় না। উঁচু থেকে তাকিয়ে নিচের মানুষকে মানুষ ক্ষুদ্রই দেখে। অথচ কতো খাবার; কত খাতা-পত্র দিয়ে প্রতিনিয়ত ওকে সাহায্য করেছে সহপাঠিরা। এরা কি ভুলে যায়? না ভুলে থাকে এরা কাছের মানুষকে? কে জানে!
সেই টিফিনের খাবার গুলো সব খেয়ে ফেলতো না তোহির সাহেব। লুকিয়ে কিছু মায়ের জন্য নিয়ে আসত। মা খুব খুশি হয়ে বলতেন, বাপ তুমি খাও। তুমি খাইলেই আমার খাওয়া হয়। তবু জোর করে মাকে এক চিমটি হলেও খাওয়া তো তোহির সাহেব। তার মা জোবেদা খাতুন এই স্কুলেই চাকরি করতেন লাইব্রেরিয়ান হিসেবে। তোহির সাহেবের পিঠাপিঠি ছোট ভাই আরিফ পড়ত ক্লাস সিক্সে। তখন এসএসসির পরীক্ষার্থী তোহির সাহেব। তিনি ক্লাস করে বেরিয়ে দেখলেন আরিফ কাঁদছে বারান্দায় দাঁড়িয়ে। কাছে গিয়ে ভাইকে জড়ালেন বুকে। বললেন,
– কী হয়েছে?
– সান্তানুদা আমাকে চড় মেরেছেন ।
– কেন?
– তিনি বলেছেন তার সাথে টিফিনের বালতিটি ধরে ক্লাসে ক্লাসে নিতে। আমি পারবো না বলেছি বলে; দেখ কি করেছে।
ওর ফর্সা দুগাল সিঁদুররঙা হয়ে আছে। ওদিকে তাকিয়ে তোহির সাহেবের রাগ হলো। তিনি বললেন,
– নাওনি কেন?
– কি করে নেব। কাল যে আমার হাত কেটে গেছে; মনে নেই তোমার! সেই ব্যথা এখনও কমেনি। তাছাড়া জ্বরে আমার গা কাঁপছে।
– টিফিন খেয়েছো?
– দেয় নি আমাকে। খুব খিদে পেয়েছে।
– তুমি মায়ের রুমে গিয়ে বস। দেখি কি করতে পারি। সান্তানু কোন দিকে গেছে?
আরিফ আঙুল তুলে উত্তর দিকে দেখাল। সেদিকে হাঁটতে থাকে তোহির সাহেব।
এসএসসির বিদায় ঘনিয়ে আসে। সবাই বিদায় অনুষ্ঠান নিয়ে ব্যাস্ত। হঠাৎ সহপাঠি অনিন্দিতা একটি চিরকুট দিয়ে বললো, পরে পড়িস্। দুপুরের ক্লাস বিরতিতে তোহির সাহেব বাথরুমে ঢুকে তা পড়লেন। তাতে লেখা “একজন তোমাকে ভালোবাসে, সে সন্ধ্যায় বলেশ্বর ব্রিজে দাঁড়িয়ে থাকবে। তুমি ঠিক সাতটায় এসো।” সামান্য লেখা ছিল যদিও; তবু দরদর করে ঘামতে থাকলেন তিনি। কে সে? কে তাকে ভালোবাসে? তাকে দেখার একটা তীব্র ইচ্ছে দৌড়াতে থাকে। অনুষ্ঠান আয়োজনে সবারই উপস্থিতি আছে। মেয়েদের মুখের দিকে আড়ে আড়ে তাকালেন তোহির সাহেব। কারো মুখেই লাজুক লতার লজ্জা মেশা নেই। সবাই স্বাভাবিক। হাসছে, গানগাইছে, গল্পগুজব করছে। তিনিও কাজে মন দিলেন। মনের সাথে অনেক বোঝা পড়া করে সন্ধ্যায় যথা সময়ের কিছু পর বলেশ্বর ব্রিজের দিকে রওয়ানা দিলেন। দেখলেন ম্লান চাঁদের আলোকে ভেসে যাওয়া ব্রিজের উপর একটি ছায়া দাঁড়িয়ে আছে। তিনি থেমে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর রহস্য উন্মোচনে পা বাড়ালেন। কাছে গিয়ে তার মাথা ঘুরতে থাকে। তিনি কিছু বলতে পারছেন না বা সাড়া দিতে পারছেন না যে, আমি এসেছি। ছায়া মূর্তিটিও তার দিকে ফিরে না। অনেক সময় পার হয়। তোহির সাহেবের মাথাটা জোরে ঘুরতে থাকে। তিনি ব্রিজের উপর বসে পড়েন। ছায়া মূর্তিটি তাকে দেখলো কি দেখলো না; কিছু বুঝা গেল না। সে ব্রিজ থেকে নেমে ব্রিজের ডানে যে বাড়িটি আছে সেদিকে হাঁটে। ঐ বাড়িটি অনিন্দিতাদের। ওর বাবা একজন ম্যাজিস্ট্রেট। স্বপ্ন আর বাস্তবতার ফারাক চিরকাল যোজন যোজনই হয়; প্রথম বুঝতে পারে তোহির সাহেব। এরপর তিনি এও বুঝতে পারেন তাদের মতো নিন্মবিত্ত মানুষের লেখা-পড়া করা ছাড়া কোন পথ নেই স্বপ্ন ছোঁয়ার। তাই তিনি সাধনা করেছেন তারপর থেকে লেখা পড়া নিয়ে। পিছনের ঝড়ঝঞ্ঝা কিছুই উলট পালট করে দেখেন নি কোন দিন। সহপাঠিরা কে কোথায় আছে; সে খবরও জানেন নি। দু‘চার জনের সাথে দেখা হতো মাঝে মাঝে। ঢাকা এসে পড়াশুনার পাশাপাশি টিউশনি করাতেন তোহির সাহেব। মাসে যা পেতেন নিজের চলে যেত ভালোই। কিন্তু মায়ের বিবর্ণ মলিন ভাঙা মুখটা কষ্ট দিতো খুব। তাই নিজে কষ্ট করে চলেও মাকে কিছু টাকা পাঠাতেন। মা খুশি হয়ে চিঠি লিখত “বাবা তুমি সব টাকা আমাকে পাঠিয়ে দিও না। খাওয়া দাওয়া ঠিক মত করিও। তোমার যত্ন নিও। যদি পারো মায়ের সাথে একবার দেখা করে যেও। তোমাকে দেখার জন্য চোখ ব্যথা করে।মনটা আকুল হয়ে আছে।” মাকেও ফিরতি চিঠি লিখতেন তোহির সাহেব। তিনি জানেন মা পোস্ট মাস্টারের পথ চেয়ে থাকে। চিঠি পেলে মায়ের চোখের কাজল লেপ্টে যাবে। ফর্সা নাক ডালিমের মত লাল হবে। তিনি হেঁচকি তুলতে তুলতে আল্লাহর দরবারে হাত তুলবেন। চিঠি তার লিখতে ইচ্ছে হতো আরেক জনকেও। মনে মনে তাকে অসংখ্য চিঠি তিনি লিখেন। যে চিঠির খামগুলোর মুখ খুলে কেউ কোনদিন পড়বে না। কেউ কোনদিন দেখবে না। জানবে না চিঠির কথাও। বিনষ্ট চিঠিগুলোর ভাজ নিজেও খুলে কখনও দেখেন না; পাছে তিরতির করে উঠে কষ্ট। ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে লাইব্রেরী এন্ড ইনফরমেশন সায়েন্স এ মাস্টার্স শেষে তিনি এখন বুয়েটের সেন্টাল লাইব্রেরীতে সিনিয়র সহকারী লাইব্রেরীয়ান পদে চাকরি করছেন। মাকে তার বেশি মনে পড়ে এখন। আহ্! এখন তাকে সুখ দিতে কোন টানাপোড়েন বা ট্রাজেডির শিকার হতে হতো না। অথচ এখন তিনি নেই। এখন মাঝে মধ্যেই তাকে তার শৈশব কৈশোর টানে। টান লাগে গহিনের সুতোহীন বন্ধনেও। অনামিকা আছে তার জীবনে এবং সংসারের অংশ হয়ে। থাকবে চিরকাল। আছে মুনিয়া আর তিতলি। দু‘মেয়ে কলেজে পড়ে। দেখতে দেখতে বড় হয়ে গেল মেয়েগুলো। নিজের উদাসীন লাগলেই তিনি চলে আসেন ঢাকার হট্টোগোল ছেড়ে পিরোজপুরে। কখনও বাড়িতে বাবা মায়ের কবরের পাশে, কখনও এখানে এসে সময় কাটিয়ে যান। ছোট দু‘ভাই পড়াশুনা শেষ করেছে। আরিফ ঢাকা কলেজের শিক্ষক। আসরাফ সিটি কলেজের শিক্ষক। হঠাৎ তোহির সাহেবের বাইকের পেছনে এসে থামে একটি গাড়ি। ড্রাইভার জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলছে, রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? মরবার শখ হয়েছে? যত পাগল ছাগল। দেখি দেখি বাইকটি সরিয়ে নিন। দেখতে তো ভদ্রলোক মনে হয়। রাস্তা আগলে আছেন কেন? গাড়ির ভেতর থেকে কেউ মৃদুস্বরে বলছে, এই আক্কাস এমন ব্যবহার করছো কেন? ভদ্রলোক কোন কারণ ছাড়া ও ভাবে দাঁড়াবেন কেন? তুমি ওনাকে সরি বল! কণ্ঠস্বরটি মোহাচ্ছন্ন করে তোহির সাহেবকে। তিনি স্মৃতির পেরেকগুলো তুলে দূরে ছুঁড়ে ফেলেন। তারপর বাইক ঘুরিয়ে বাইকে উঠে বসেন। সেসময় গাড়ির জানালা দিয়ে মুখ গলিয়ে স্নিগ্ধস্বরে ডাকে অনিন্দিতা “বাপ্পী! বাপ্পী! দাঁড়া! দাঁড়া!” তোহির সাহেব তার বাপ্পী নামটি বহুবছর পর কারো মুখে শুনতে পেয়ে শিহরিত হন। তিনি বাইক থামিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে ফিরতি বিকেলের উল্লাস মেখে হাসেন।

By | 2018-06-14T18:49:54+00:00 June 14th, 2018|ছোট গল্প|0 Comments

About the Author:

Leave A Comment

error: Content is protected !!