পরম্পরা – লাইজু শামীম

Home/ছোট গল্প/পরম্পরা – লাইজু শামীম

পরম্পরা – লাইজু শামীম

এক
সুমনা নেই। বাসার কোথাও নেই। কিরে কেউই কি নেই? ইফতি, ইফা তোমরা কোথায়? এরুম ও রুম দেখে যখন কাউকে পেল না,তখনই মনিরের টেনশন শুরু হতে লাগলো। সন্ধে সাতটা বাজে, বাহিরে ঘুরতে গেলে তো অবশ্যই এতক্ষনে চলে আসার কথা।কিন্তু কোথায় গেল? ছোট ছোট বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে কোথায় যাবে সুমনা? ওতো কখনো আমাকে না বলে বের হয়না!
সুমনার ফোনটাও বন্ধ। কোনো বিপদে পড়েনি তো? আমার কোনো বন্ধুর বাসায় গেলে তো বলে যেতো, দেখি কারো বাসায় গিয়েছে কিনা।সুমি ভাবীকে ফোন দিয়ে জানি।
: সুমি ভাবী কেমন আছেন?
: ভাল আছি ভাইয়া । আপনি কেমন আছেন?
: হ্যা ভালো! সুমনা ইফতি, ইফাকে নিয়ে আপনার বাসায় গিয়েছে?
: না মনির ভাই ,সুমনা ভাবী আপনাকে বলে বের হয়নি?
: বলে যায়নি বলেই তো ফোন দিয়েছি।কখন যে বাসা থেকে বের হয়েছে তাও জানিনা।আমি সকালে যখন যাচ্ছিলাম তখন সুমনা একটু কেমন যেন করছিল, কি যেন বলবে বলবে একটা ভাব তার চোখে মুখে ছিল, আমার তাড়া ছিল তাই আর জিজ্ঞেস করা হয়নি।
: এখন তো রাত নয়টা বাজে।ভাইয়া ভাবীর সাথে কি আপনার কোন ঝগড়া হয়েছে?
:না মানে সুমনা অনেক দিন ধরেই একটা আবদার করছিল,আমি সেটায় গুরুত্ব দেইনি।
: আপনি এক কাজ করেন পুলিশকে জানান, ওদের ছবি নিয়ে যাবেন কিন্তু সাথে।
মনিরের মাথায় আকাশ ভেংগে পড়লো। কি করবে?
মনির মনে মনে বলে না কারো বাসায় ও যায়নি।তাহলে কি করে জানব আমি।আচ্ছা সুমনার দূর সমর্পকের মামা আছে তার কাছে একটা ফোন দিয়ে দেখি, আবার ভাবে তাকে ফোন দেওয়া যাবেনা।
বিদেশের বাড়ি, এখানে আমাকে সবাই তেমন চিনে না। দেশের কয়েকজন পরিচিত আছে যাদেরকে বললে আমার উপকার হবে না বরং তারা দেশে ফোন দিয়ে নানা কথা শুনাবে।
কি করবো খুঁজে পাচ্ছেনা মনির। মনিরের ছেলে ইফতি ও মেয়ে ইফা।সুমনার সাথে মনিরে বিয়ে হয় বাবা মায়ের পছন্দসই। ছয় বছর হয়ে গেল সংসার করছে।
সুমনা সুন্দরী মেয়ে, যাকে অপরূপ সুন্দরী বলা যায়। তার বিয়েতে তেমন মত ছিলনা, সেটা সুমনার বাবা মা মনিরের পরিবারকে জানায় নি।সুমনা ও স্মৃতি দুই বোন। বাবা শরিফ আহম্মদ একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করতেন। মা আমেনা বেগম গৃহিনি হলেও শিক্ষিত ছিলেন।
দুই মেয়ে দেখে শরিফ আহম্মদ প্রায়শই আমেনা বেগম কে বকাঝকা করতো।
শরিফ আহম্মদ বলতো আমার ছেলে নেই, দুইটাই মেয়ে, আমি বুড়ো হলে কে খাওয়াবে আমাকে! আমার বংশধর কেউ থাকলোনা! আমাকে সারাজীবন কাজ করেই যেতে হবে! এসব শুনে শুনে আমেনা বেগম প্রায়ই কান্না করতো। মেয়েদেরকে বলতো তোমরা মানুষের মতো মানুষ হয়ে বাবাকে সাহায্য করো,দেখ তোমার বাবা ছেলে হয়নি বলে আমাকে অনেক কথা শুনাচ্ছে। আমি মেয়ে বলে কোনো চাকরি করতে দিচ্ছেনা, কিন্তু টাকার জন্য ঠিকই কথা শুনায়।
সুমনা বড় মেয়ে, তার জন্য অনেক ছেলে আসে বিয়ের প্রস্তÍাব নিয়ে, আমেনা বেগম রাজী হয়না, সুমনা ছোট বলে সবাইকে না বলে দিতো ।

দুই
সুমনার এস,এস, সি রেজাল্ট যেদিন দিবে সেদিনই সুমনাকে দেখতে মনিরের বড় দুই ভাবী ও এক ভাই সুমনাদের বাড়িতে যায়। সুমনার মামা মনিরের ফ্যামিলিকে অনেক পছন্দ করতো, অনেকদিন ধরে মনিরের বড় ভাইর সাথে তার পরিচয়, ধানমন্ডি হাঁটতে গিয়ে পরিচয় হয় তাদের।এভাবেই ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে।
একদিন মনিরের বড় ভাই (মাসুম) সুমনার মামা (রবিন)কে বলে,

: আমার ছোট ভাইর জন্য একটা মেয়ে দরকার, তাকে বিয়ে করাবো।
: আপনার ভাই কি করেন? কি পাস করেছে?
: আমার ভাই এইচ, এস, সি পাশ।সে ইতালি থাকে।সেখানে নাগরিকত্ব পাওয়া।
বিয়ে করে সেখানে বউ নিয়ে যাবে, বিয়ের পর সেখানে বাড়ি কিনতে চায়।
বাংলাদেশে তার আসার ইচ্ছে একেবারেই নেই।শুধু প্রতি বছরে একবার দেশে এসে বেড়ানোর ইচ্ছা।
: আমার একটা ভাগিনী আছে, যদি ভালো মনে করেন, তাহলে দেখতে পারেন।
: কি পাস? বাবা কি করেন? কোথায় থাকে?
: এবার এস,এস,সি দিয়েছে, সোনারগাঁ বাড়ি। বাবা একটা ছোটখাটো প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করেন।
: কয় ভাই বোন?মেয়ের নাম কি?
: দু’টোই মেয়ে। সুমনা আর স্মৃতি, সুমনা বড় এবার এস,এস, দিয়েছে।স্মৃতি এবার ক্লাস এইটে । আমার ভাগিনী বলে বলছিনা দেখতে অনেক সুন্দরী।
: আচ্ছা একদিন গিয়ে দেখে আসবো, যদি পছন্দ হয় তাহলে আমরা বেয়াই হবো হা হা হা।
: ছেলে দেখে পছন্দ না করলে তো আর বেয়াই হবো না,হাহাহা।
: আমার ভাই আমার কথার উপরে কথা বলেনা,আমি যা বলি তাই করবে। আমার পছন্দই তার পছন্দ,আমরা তিন ভাই এক বোন। বাবা মারা যান ওকে ছোট রেখে, আমি ওকে পড়ালেখা করাই। বলতে পারেন বাবার দায়িত্ব আমিই করেছি।আমার মা বুড়ো মানুষ, তার কোনো পছন্দ ওপছন্দ নাই।আমি যা ভালো মনে করি তাই সে মেনে নিবে।
: তাহলে আসেন একদিন সময় করে। আমি আমার বোনকে বলে রাখবো।
: যেদিন যাবো সেদিন খেয়েই আসবো, না খেয়ে আসবোনা।

মনিরের ভাই ভাবীকে দেখে সুমনার মা বেশ খুশি। আপ্যায়নে কোনো ত্রুটি ছিলনা। দুপুরবেলা খাবারের জন্য সুমনার মা ভীষণ ভাবে বলে যাচ্ছেন, কিন্তু মাসুম সাহেবের জরুরী কাজ আছে বলে আসার জন্য ব্যস্ততা দেখায়।এদিকে সুমনার চাচী সুমনাকে শাড়ি পড়িয়ে হালকা সাজে নিয়ে আসে সবার সামনে।সুমনাকে দেখে সবার চোখ আটকে যায়, এত সুন্দর লাগছে সুমনাকে।
সুমনা সালাম দেয়,সবাই এক এক করে প্রশ্ন করতে থাকে, সুমনা ভয়ে ভয়ে কাপা কাপা গলায় উত্তর দিয়ে যাচ্ছে একের পর এক।
মাসুম সুমনাকে বলে তুমি আমার ছোট বোন হবে?আমার ছোট বোন নেই।সুমনা চুপ করে শুনে যাচ্ছে,উত্তর দিচ্ছেনা। মাসুম তার বউ রোজি বেগম কে পিসপিস করে কি যেন বলছে,সেদিকেও খেয়াল সুমনার।
হঠাৎ করেই রোজি বেগম সুমনার হাত ধরে এনে একটা রিং পড়িয়ে দেন।ফ্যাল ফ্যাল করে তা্কিয়ে আছে সুমনা। যেন সুমনার জোছনা রাতে মেঘে ঢাকা চাঁদের আলোহীন আভায় সুমনার স্বপ্নগুলো কেমন যেন অমানিশার অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে।
সুমনার মা বাবা বেশ খুশি।সুমনার মুখে হাসি নেই, চোখেরজল গড়িয়ে পড়ছে।সুমনার চোখেরজল দেখে রোজি বেগম বলে কেন কান্না করছো?তোমাকে আমার বোন বানিয়েছি।
এদিকে সুমনার রেজাল্ট বের হল, সুমনা খুব ভাল রেজাল্ট করে, কিন্তু সুমনার মাথায় একটা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে, বাবা মা কেন আমাকে এত তাড়াহুড়ো করে সরায়ে দিচ্ছেন। দুপুরবেলা খাবার শেষ করেই আসতে হয়েছে মনিরের পরিবারের।ঢাকা এসে মনিরকে ফোন দিয়ে সব জানায় বড় ভাবী।মনির বলে ভাইয়া যা ভাল মনে করেন তাই হবে।
মনির খুব খুশি। দেশে আসার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠে। পরের মাসেই মনির পাঁচ মাসের জন্য বাংলাদেশে আসেন।

এদিকে সুমনা বাবা মায়ের সাথে কলেজে ভর্তি হবে সেটার জন্য পিড়াপিড়ি করছে। বাবা মায়ের এক কথা তোমাকে বিয়ে দিয়ে বিদেশ পাঠাবো, সেখানে গিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পাড়বে, কেউ বুঝতে চাচ্ছে না কি যে মনের ব্যাথা সুমনার।মনের গভীরতা কেউ খুঁজছে না।
সুমনা ভাবছে আমি মেয়ে বলেই কি কোনো কথা বা স্বপ্নের মুল্য নেই? মেয়েদের কি স্বপ্ন দেখতে নেই? সুমনার মনে অনেক প্রশ্ন উঁকি দেয়।খুঁজে পাচ্ছে না সুমনা তার প্রশ্নের উত্তর।চোখেরজলে বুক ভাসায় সুমনা বাবা মায়ের আড়ালে।

মনির দেশে এসেই বিয়ের কথা পাকা করে ফেলে, কিন্তু মেয়ে ছেলে কেউ কাউকে এখনো দেখেনি। শুধুই মেয়ের মামা মনিরকে দেখেছে।সুমনা ছোট বোন স্মৃতিকে জিজ্ঞেস করে,
: কিরে আম্মু আব্বু কি ছেলেকে দেখেছে?
: না দেখেনি,তবে মামা দেখেছে।
: মামা কি বললো ছেলে দেখে?
: মামা আম্মুকে বলছে সব দিক তো পাওয়া যায়না একসাথে। ছেলের বয়স একটু বেশি, সেটা তেমন কিছু না। যেহেতু ছেলে বাহিরে থাকে আর তোর সংসারে ও আকাল। সুমনাকে বিদেশ নিয়ে যাবে। আমার মনন তোর দুঃসময়ে সুমনা হাল ধরুক,আর সেটা ও বিদেশ গেলেই একমাত্র সম্ভব।
সুমনা নির্বিকার হয়ে ছোট বোন স্মৃতির সব কথা শুনে মনে মনে বলে, নির্ধন বলেই আমাকে সব মেনে নিতে হবে? সুমনার মর্মব্যথা কতটা শুধু সুমনাই জানে। দেখতে দেখতে বিয়ের তারিখ চলে আসছে, কাল হলুদ, ছেলের বাড়ি থেকে অনেক লোক আসবে, সুমনাকে হলুদ দিতে,রবিন এসে আমেনা বেগমকে বলে।

: ছেলেদের অনেক আত্মীয়স্বজন,সবাই ঢাকা থাকে, কাকে রেখে কাকে আনবে তাই আমাকে মাসুম সাহেব বললো হলুদে সত্তর জন আসবে।আর বিয়েতে প্রায় ১৫০ জন আসবে।
: আমার প্রথম মেয়ের বিয়ে, আমার যত কস্টই হোক, তাদেরকে আসতে বলো।আমার একার পক্ষে এত বড় অনুষ্ঠানের সব দিকে নজর রাখা সম্ভব হবে না, ভাবীকে রাতেই পাঠিয়ে দিবেন।কাল ত অনেকেই আসবে কিন্তু কেউ কাজের না, সবাই মজা করতে পছন্দ করে, কিন্তু কাজের কাজ একটা ও করবেনা।

তিন
আজ সুমনার গায়ে হলুদ,কেউ কেউ আনন্দে শিস বাজাচ্ছে প্রমোদ করছে।রবিন খুব খুশি তাই ভাগিনীর বিয়েতে গানের আয়জন করছে যাতে বর পক্ষ আনন্দ পায়,আর সুমনাও বলতে পারে আমার বিয়েতে সব কিছুই পূর্ণ হয়েছে।
সুমনা দূর থেকে শুনছে সুরের ঝংকার, আস পাশের ঘর থেকে বউ ঝি’রা বের হয়ে এসে দাঁড়িয়েছে মঞ্চের পাশে। সুমনা গানের মাঝে খুঁজে বেড়াচ্ছে হৃদয়ে আকুলতা।শত দুঃখ কষ্টের মাঝে ও গান শুনছে সুমনা।এত কিছুর মাঝে ও কি যেন শূন্যতা রয়েই গেছে।
বর পক্ষ এসে হলুদ শেষ করে চলে গেছে। পরের দিন ছেলের হলুদ, মেয়ের পক্ষ থেকে তেমন লোক আসেনি কয়েকজন আসছে, ছেলের বাড়ির আয়োজনের বিশালতা দেখে মেয়ের পক্ষের সবাই মুগ্ধ, কিন্তু মেয়ের এক বান্ধবী রতœা সে খুশি হতে পারেনি। রতœা মনিরকে দেখেই চিন্তায় পরে গেল।কেন দিচ্ছে এখানে বিয়ে?সুমনা কত্ত সুন্দরী লক্ষী একটা মেয়ে, ওকে কি করে এই ছেলের কাছে বিয়ে দিচ্ছে? নানান প্রশ্ন রতœার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
বিয়ের দিন সুমনা কবুল বলতে গিয়ে অনেক কান্নাকাটি করে, সেখানেও মামার ধমকে কবুল বলতে বাধ্য করা হয়। বিয়ে শেষ শশুর বাড়ি আসে,বিয়ের প্রথম রাতেই সুমনা মনিরকে বলে আমি এই বিয়েতে রাজি ছিলাম না, দেখেন আপনি আমার কাছে ভালবাসা আসা করলে ভুল করবেন, এই বলে সুমনা ঘুমিয়ে পড়ে।মনির সারারাত ছাদে একের পর এক সিগারেট খেয়েই যাচ্ছে, রাত তিনটায় মনিরের বোনের ছেলে সুমন ছাদে গিয়ে দেখে মনিরকে। যদি ও সুমনের সমর্পকে মামা হয় মনির, বয়সে কাছাকাছি না হলেও বেশ বড় সুমন।মামার সাথে তার সখ্যতা ভাল। মনির সুমনকে সব খুলে বলে, সুমন বাসায় গিয়ে সুমনের আম্মু হাদিয়াকে সব খুলে বলে। হাদিয়া দৌড়ে ছাদে যায়, মনিরকে বলে তুই চিন্তা করিসনা সব ঠিক হয়ে যাবে।প্রথম কয়েকদিন একটু আধটু মেয়েরা এসব বলেই থাকে, পরে সব ঠিক হয়ে যায়।সকালে উঠে সুমনা দেখে মনির রুমে নেই, সুমনা মনে মনে চিন্তা করে সকালে মামা আসলে সব কি মনির বলে দিবে? আচ্ছা আমাকে এখন আর এত ভেবে চলবেনা। নতুন বউয়ের নিয়ম সকালে শাশুড়িকে সালাম করা, যাই গিয়ে সালাম করে আসি। সবার সাথে সুমনা খুব সুন্দর ব্যবাহার করে, নান্তা খেতে বড় ভাবী রোজি বেগম মনির ও সুমনাকে একসাথে বসতে বলে, সুমনা তখন আপত্তি করে বলে
: ভাবী আমি আপনার সাথে খাবো।
: আচ্ছা কাল থেকে আমার সাথে খাবে, আজ নতুন জামাই বউ একসাথে নান্তা করো।
: আচ্ছা ভাবী আমি পরে খাই, আপনারা একসাথে নান্তা করেন।
রোজি বেগম মনে মনে ভাবে দু’জনের মধ্যে কেমন যেন দুরত্ব দুরত্ব ভাব।সে ইনিয়েবিনিয়ে অনেক মজা করছে সুমনা ও মনিরের সাথে।কিন্তু সুমনা এসবে কান দিচ্ছেনা। মনিরের বোন হাদিয়া রোজি বেগমের কাছে সব খুলে বলে,রোজি বেগম এসব শুনে খুব টেনশন করতে লাগলো।রোজি বেগম মনিরকে ডেকে তার রুমে বসায়ে সব শুনে, এবং বলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিদেশ নিয়ে যাও আর বাচ্চা নিয়ে নাও, বাচ্চাকাচ্চা হয়ে গেলে দেখবা এসব মাথা থেকে নেমে গেছে।
মনির খুব চালাকচতুর, সে আস্তে আস্তে সুমনার সব কথা শুনে হাত করে। সুমনাও নিজেকে নিয়ে ভাবে বিয়ে হয়ে গেছে আমার। সব মানিয়েই চলতে হবে,কিন্তু আমি মনির কে বলবো আমি পড়তে চাই। সুমনার চারদিকে আলো মাখা অন্ধকার।

চার
এভাবেই দুজনের মধ্যে মিল হলেও সুমনার মনে থাকে একটা স্বপ্ন, সে পড়বে, সে মনির কে জানায় , মনির ও সুমনাকে আশ্বাস দেয় সে ইতালি গেলে পড়তে দিবে, বাংলাদেশে সম্ভব না। মনিরের ছুটি প্রায় শেষ হয়ে আসছে, সুমনাকে নিতে আরও আট মাস লাগবে।এই কয়মাস সুমনার ইচ্ছে তার বাবার বাড়িতে থাকার, এটা মনিরে পরিবার মেনে নেয়।মনির চলে যায় ইতালি।সুমনা থাকে বাবার বাড়িতেই। প্রতিদিন সুমনা বান্ধবীদের সাথে ঘুরে, এখানে সেখানে,সুমনার মনে যে কস্ট আছে সেটা কারো সাথেই সেয়ার করে না, বান্ধবী রতœা কলেজে যাচ্ছে আসছে এসব দেখে ভীষণ ভাবে আপ্লুত হয় সুমনা।
দেখতে দেখতে কেটে যায় আট মাস, সুমনার ভিসা রেডি,মনির সুমনাকে একাই যেতে বলে,ইতালি মনির সুমনাকে এয়ারপোর্ট রিসিভ করবে জানায় ফোনে।সুমনার মন খারাপ হয়েও আবার একটা নতুন স্বপ্নের আসায় নিজেকে সামলিয়ে নেয়।
বাবাকে যাওয়ার সময় শুধু এটুকুই বলে যায় বাবা তুমি মাকে বকা দিওনা! বাবা শরিফ আহম্মদ অশ্রঝরা নয়নে তাকালো মেয়ের দিকে।মাকে বলে মা তুমি মেয়ে আমিও মেয়ে তাই একটা জায়গায় এসে তোমার গল্প আমার গল্প এক হয়ে যাচ্ছে। দোয়া করো, মা আমেনা বেগম হাউমাউ করে কেঁদে কেঁদে বলে আমি পারিনি মা তোর স্বপ্ন পুরন করতে, সুমনা বুকের ব্যথা বুকে চেপে মায়ের মুখের কথার রেশ টেনে বলে উঠে,দুঃসংবাদ কিনা জানি না তোমার লালিত কন্যাকে ধনাঢ্য লোকের কাছে বিয়ে দিয়েছো, অসহায় গরিব মেয়ে আমি তাই এই দেশে আমার স্বপ্ন পূরণ হয়নি।দেখি বিদেশে গিয়ে কতটুকু পারি স্বপ্ন পূরন করতে!সুমনার কথা শুনে মা অমনি বসে পড়লেন হাটু গেরে। এ যে নির্মম, অভাবনীয়। সুমনা চলে যায়, নীরব নিস্তব্ধতায় এক গোমট পরিবেশ আচ্ছন্ন করে বাবা ও মাকে!
মনির সুমনাকে রিসিভ করে বাসায় নিয়ে যায়,চলতে থাকে দু’জনের সংসার। এরই মধ্যে সুমনা দুমাসের অন্তঃসত্ত্বা, ভুল করেই হয়েছে।সুমনা জানতোনা বিদেশে বাচ্চা নষ্ট করা যায় না, ও ভিষনভাবে ভেংগে পরে কিছুতেই বাচ্চা রাখবেনা। মনির সব কিছু জানতো।মনিরের ইচ্ছে ছিল বাচ্ছা নিয়ে বিজি থাকলে সুমনা আর পড়ার সময় পাবে না, আর তখন ও পড়ার জন্য মর্জি করবেনা।নাছোড় বান্দা সুমনা কিছুতেই সে পড়া বাদ দিবেনা,
মনির একদিন ডাঃ দেখাতে নিয়ে যায় সুমনাকে, সুমনা এত দিনে মনিরের থেকে ভাষা শিখেছে, ডাঃ এর সাথে সব কথা বলে শরিরের, সেদিন ডাঃ কিছু পরিক্ষানিরিক্ষা করতে দেয়, পরের দিন রিপোর্ট দেখাতে সুমনা একা যায় ডাঃ এর কাছে। ডাঃ এর সাথে সুমনার ভাল পরিচয় হতে শুরু করে। ডাঃ প্রায়শই ফোনে সুমনার সমস্যা জানে।একদিন সুমনা খুব অসুস্থ হয়ে পরে,ডাঃ কে কল করে বাসায় আসতে বলে, বাসায় আসেন ডাঃ। সুমনার একটু ভাল লাগতে থাকে, তখন দু’জনে গল্প করতে গিয়ে সুমনা পড়ার আগ্রহ জানায়,তখন ডাঃ শুনে খুব খুশি, সে বলে আমি তোমাকে ভর্তি করায়ে দিব। আমাদের দেশে বেবি বড় করা সহজ। তোমার পড়ায় ক্ষতি হবে না।সুমনা মহা খুশি।মনির বাসায় আসলে সুমনা সব খুলে বলে।মনিরের আস্তে আস্তে তিক্ততা বাড়তে থাকে সুমনার পড়ার কথা শুনলেই।এর মধ্যে চলে আসে কোল ঝুরে ছেলে ইফতি, ছেলে পেয়ে দু’জন খুশি। এবার সুমনা ভাবে আর বসে থাকলে চলবে না আমাকে পড়াশুনায় আগাতেই হবে।সুমনা ডাঃ এর সাথে কথা বলে পড়াশুরু করলে মনির তা মেনে নেয়। কিন্তু আগের মতো সুমনাকে মনির সময় দেয় না, ছেলেকে নিয়ে সুমনা সকালে স্কুলে চলে যায়।
পাঁচ
বাংলাদেশে এস,এস,সি পাশ করা সত্তে ও ইতালিতে আবারও এস, এস,সি দিতে হচ্ছে সুমনাকে। সেই দেশের পড়ার নিয়ম অন্য রকম, সেই দেশ অনুযায়ী সুমনা আস্তে আস্তে আগাচ্ছে। পরিক্ষায় ভাল রেজাল্ট করে,এখন ইফতির বয়স দু’বছর।আবার ও কোল আসে আরেক সন্তান মেয়ে ইফা।মনির চতুর বলে সুমনা পেরে উঠেনা। অনিচ্ছা সত্যেও দুটি বাচ্চা হয়ে যায়।
সুমনার খুব কস্ট হয় পড়তে, সময় দিতে হয় দুই বাচ্চাকে, সুমনার বয়স কম। এই বয়সে দুটি বাচ্চা কারো সাহায্য ছাড়া বড় করা সহজ নয়।
তবুও সুমনা হার মানতে রাজি নয়। সুমনার ইচ্ছে বাচ্চাদের ডে কেয়ারে দিয়ে ও পড়াশুনার পাশাপাশি কিছু করবে।
মনির সুমনার সাথে কথা খুব কম বলে,পড়ার খরচ দিতে চায়না,অনেক তোষামোদ করে টাকা নিতে হয়। আস্তে আস্তে সুমনার প্রতি অত্যাচার করতে শুরু করে মনির।
: মেয়ে হয়েছো। কাজ কেন করবা? আমি কাজ করি তাতে তোমার হয় না?
: আমার ভাই নেই বলে বাবা মাকে কথা শুনাইত। আমার বাবা মায়ের জন্য চিন্তাা করতে হবে।আমি মেয়ে তাতে কি হয়েছে,মেয়েরা কি কিছু করতে পারে না?
: যদি কাজ করতেই হয় তাহলে সব ছেড়ে দিয়ে চলে যাও।
: আমি ছাড়ার জন্য আসিনি, কিন্তু আমার স্বপ্ন ও আমি পূরণ করবই।
: বাবা মায়ের জন্য চিন্তা করলে বিয়ে কেন বসলে?
: আমি বিয়ে করেছি বাবার অভাব বলে, আমি সব ছেড়ে এসেছি বাবা মা সবার কথা চিন্তা করে।
: শুনে রাখো কান দিয়ে আজকের পর তুমি আর পড়তে যেতে পারবেনা, আর চাকরি কোনো দিন আমি করতে দিবো না।
সুমনা চুপ চাপ করে সব শুনছে, কিছুক্ষন পর মনির বাসা থেকে বের হলে সুমনা ডাক্তারের সাথে খুলে বলে। ডাক্তারের কথা মতো বাসা থেকে বের হয়ে আসে ।

মনির কি করবে মনে মনে চিন্তা করে, কোথাও নাই সুমনা ইফতি ইফা,সুমনার আলমিরা খুলে দেখে কাপড় চোপড় তেমন নাই।তখন মনিরের সন্দেহ হয়। সেখানে একটা কাগজ পায় মনির। কাগজ খুলে লিখাটা পড়তে থাকে সুমনার হাতের লিখা-

মনির…
প্রিয় বলতে পারছিনা তোমাকে, বাবা আদর করেই আমার নামটা সুমনা রেখেছে,সুমনার আজ আর মন টা সু-মনা নেই! সেই সু-মনা তে অজস্র কস্ট, হতাশা, ব্যর্থতা, স্বপ্ন পূরন না হওয়ার দগ্ধ আজ এই মনা! আমি জানি তুমি আজ আমাদের জন্য খুব পেরেশানিতে আছো,কিন্তু দেখ আমাদের দুই জনের মধ্যখানে প্রতিবাদী ও সামর্থ্য নামের দেয়াল দাঁড়িয়েছে। আমার বয়স যখন ষোলো তখন বাবা মা আমাকে তাদের কাছে রাখেনি।সেটাকে সামর্থ্যের দেয়াল বললেই চলে।আমিও চেয়েছি আরো আট দশটা মেয়ে ছেলের মত পড়া লেখা করে মানুষের মত মানুষ হতে! কি পোড়া কপাল আমার! ভাগ্য আমাকে দেয়নি,মেয়েরা নাকি বাবার মাথার বোঝা, ছেলে হলে সংসারের হাল ধরতে পারে,মেয়েরা পারেনা,তাই মেয়েদের পিছনে টাকা খরচ করা উচিত না,এটা আমার বাবার উক্তি।বাবা প্রায়শই বলতো তার টাকা নেই, ছেলেও নেই, আমরা তার বোঝা, আমার মা শিক্ষিতা মহিলা সে চাইলে ছোট খাটো একটা চাকরি করতে পারতো। কিন্তু বাবা তাকে চাকরি করতে দেয়নি,মেয়েরা চাকরি করলে খারাপ হয়ে যায়, সংসার হয়না, স্বামিকে রেখে চলে যায়।
আমাকে তোমার হাতে তুলে দিয়েছে, বয়স আমার থেকে দিগুন বেশি হলেও মেনে নিয়েছি। অনেকেই বলে যেই ছেলেরা বয়স করে বিয়ে করে তাদের বউ খুব সুখি হয়।আমিও ভেবেছিলাম তুমি আমাকে সবার থেকে একটু বেশি বুঝবে, যেহেতু বিদেশে থাক, এখানে বাংলাদেশের থেকে নিয়ম নীতি সব কিছুই আলাদা।যখন দেখলাম তুমিও বাবার মতোই।তখন আমি ডাঃ আংকেল এর সাহায্য নিলাম, ডাঃ আমাকে মেয়ের মতো ভালবাসে, সে আমার সব শুনে , আইনের আশ্রয় নিতে বলে যাতে আমার চলতে সুবিধে হয়।
তোমাদের এই নির্দয়, নিষ্করুণ শত্রুতার কবলে পড়ে আমার জীবনটাই দুমড়ে-মুচড়ে কিম্ভুতকিমাকার হয়ে গেল।
মনোবল যথেষ্ট না থাকলে প্রতিবাদী হবো সেই আশা করা বৃথা।বিনাদ্বিধায় স্বীকার করবো, তেমন মনোবল আমার ও ছিল না, কিন্তু ডাঃ আংকেল বলেছে,নিজের সাথে অহোরাত্র যুদ্ধ করে ক্ষত- বিক্ষত হওয়াটাকে ও আমি এক ধরনের বর্বরতাই মনে করি।
আমি সেই বর্বরতা থেকে নিজেকে মুক্ত করতে আইনের কাছে চলে এসেছি। আর হ্যা ইফা ইফতির খরচ সরকার চালাবে, তুমি ভাল থেকো।
যদি কখনো মনে করো, মেয়েরাও মানুষ তবে সেদিন এসো, আমি সেই দিনের অপেক্ষায়…

By | 2018-06-15T09:34:49+00:00 June 15th, 2018|ছোট গল্প|0 Comments

About the Author:

Leave A Comment

error: Content is protected !!