ঠিকানা তুমি – রফিকুল ইসলাম

Home/ছোট গল্প/ঠিকানা তুমি – রফিকুল ইসলাম

ঠিকানা তুমি – রফিকুল ইসলাম

বড্ড অবেলায় এলে। টিকিটটা কাটা হয়ে গেছে আগেই। গুছিয়ে নিয়েছি লাগেজ,
জানলা লাগিয়ে পর্দাটাও টেনে দিয়েছি ঠিকঠাক।

ড্রয়ারটা চেক করলাম আবারো। ফিরে তাকালাম পিছু, কিছু রেখে গেলাম নাতো।
বাতি নিভিয়ে বেরুতে যাবো, হঠাৎ দেখি তোমার মুর্তি। দু’ হাত দরজায় দিয়ে আগলে তুমি। সারা ঘর কাঁপিয়ে বলে উঠলে-
‘না, কোত্থাও যাবে না।’

-‘কেনো।’

তুমি তাকিয়ে রইলে লাল ফোলা দুটি চোখে।
সারা রাত ঘুমাওনি ঠিক বোঝা যায়।
গনগনে রৌদ্রে এতোটা পথ দৌড়ে আসলে।
লিফট না নিয়ে সিঁড়ি ভেঙলে। ভেজা শরীর, ভেজা কপাল মাথা।
চোখের কণে ঘাম নাকী পানি বোঝা যায় না।গাল বেঁয়ে লবনাক্তের ধারা।

আমার শুকনো লোমশ হাতে তোমার নরম হাতের শক্ত থাবা। দুপুরের ঝিঁমিয়ে পড়া আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে বলে উঠলে,

-‘তোমার সব পথ এসে থেমেছে আমার পথে।
যাও কোথা।’

– ‘ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে।
আমাকে নিতে নতুন কোনো ঠিকানায়।
এখন কেনো এতো তাড়াহুড়ো, এতো আবদার। যখন জেনেছিলে চলে যাবো তখন তো ছিলে নির্বিকার।’

নির্লিপ্ত আমি তোমার হাত ছাড়াতে চাইলাম।
নরম হাতের এমন শক্ত বাঁধায় পরাভূত হলাম।
আমি হেঁটে যাই উর্ধশ্বাসে , আমার যে যেতেই হবে।
লাগেজ ধরা হাতে আমার তোমারও হাত।
আমায় তুমি ছাড়বেই না। তোমার হাওয়ায় উড়ানো শিফন শাড়ির আঁচল, খোলা চুলের অনুনয়। ঠোঁটের কোনার চাঁপা হাসি আমার চোখ এড়ায় না।

আমাকে আঁটকাবে এতোটা মনোবল তুমি পেলে কোথায়। আমি অভিমানে রাগে জোরে হাঁটি। বললাম,

– ‘আহ, মানুষ দেখলে কী ভাববে।’
– ‘ভাবুক।’
– ‘ছাড়ো।’
– ‘না।’
– ‘সবাই হাসছে।’
– ‘হাসুক।’

সমান তালে হেঁটে চলছো আমার সাথে। জানি কষ্ট হচ্ছে তোমার। যাবার সময় এ আহ্লাদ আমি চাই না। অভিমানের পাহাড় বড় হচ্ছে। ভারাক্রান্ত আমি।

স্টেশনে আমি তুমি। তুমি বললে,

– ‘তাকাবে না।’
– ‘তাকানোর কিছু নাই।
শেষ সময়ে এসে নাটক করার মানে হয় না। বাড়ি যাও। কেউ না জানার আগে।’
– ‘চলে যাবে।’
– ‘ফালতু কথা বাদ। বাড়ি যাও। বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে।’
– ‘যাবো না।’

ট্রেন ছেড়ে দিলো। বাঁশি বাজালো।
আমি দৌড়ে উঠলাম। তোমার শক্ত হাত কিছুতেই ছাড়াতে পারলাম না। নাকী চাইলাম না।

– ‘এটা কী হলো। তুমি কোথায় যাবে।’
– ‘কোথাও না। আমি তো আমার ঠিকানায়ই আছি। তুমি কোথায় যাও ভেবে আমার কাজ কী।’

ভীড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে দুজন। এক সিটে যায় না বসা তাই। বললাম, ‘বসো।’
আমার কথাকে অগ্রাহ্য করে আমার ঘামে ভেজা বুকের কাছে দাঁড়িয়ে রইলে।
আমার অভিমানের পাহাড়টা ধসে পড়েছে। চোখে এখন মায়া। বললাম,

– ‘এক কাপড়ে চলে আসলে, না বলে না কয়ে।
খাবে কী, পরবে কী।’
– ‘তুমি যা খাও, তুমি যা পড়ো।’

আমি হো হো করে হেসে উঠি। বগীর কয়েকজন আমার সাথে হেসে ওঠে। এতক্ষণ খেয়াল করিনি। আশ্চর্য লজ্জা শরম কোথায় গেলো আমার। ওর কাঁধে হাত রেখে সরু চোখে ব্রু উঁচিয়ে বললাম,

– ‘এই মেয়ে কতদূর যাবে আমার সাথে।’
ও চোখ সরিয়ে চলন্ত ট্রেনের জানলায় ছুটে যাওয়া প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে আমাকে অবাক করে দিয়ে আমার কথাগুলোই গেয়ে উঠে –

‘তোমায় নিয়ে নাও ভাসিয়ে যাবো তেপান্তর,
ভালোবাসার ঘর বানিয়ে হবো দেশান্তর…’

গানের মাঝখানেই হেসে ওঠে ও লজ্জায়।
ওকে বুক দিয়ে আগলে ধরে বলি,

– ‘আজ থেকে আমি তুমি দেশান্তরী।’

By | 2018-06-14T19:32:07+00:00 June 14th, 2018|ছোট গল্প|0 Comments

About the Author:

Leave A Comment

error: Content is protected !!