টুক-টাক – তওহিদ মাহমুদ হোসেন

Home/ছোট গল্প/টুক-টাক – তওহিদ মাহমুদ হোসেন

টুক-টাক – তওহিদ মাহমুদ হোসেন

আজিজের পুরো নাম আজিজুল হাকিম হলেও পাড়ার সবাই তাকে ডাকে “টাকলা হাকিম” বলে। আদর করেই ডাকে। কিন্তু শুনলেই আজিজের ব্রহ্মতালু চিড়বিড়িয়ে ওঠে। এই নামকরনের রহস্য উদ্ধারে অবশ্য বেশিদূর যেতে হবে না। আজিজের দিকে তাকালেই সব পরিষ্কার হয়ে যায়। আজিজের সমস্ত মাথা জুড়ে টাক। ‘স্টেডিয়াম’ টাক না। মানে চাঁদির মাঝখানে একটু টাক আর চারপাশে গ্যালারির মতো চুল – সেরকক নয়। চকচকে টাক – খাঁটি বাংলায় যাকে বলে ‘চান্দি’। সেই টাক আবার আলো পড়লে চকচক করে।

অথচ দোষটা ওর নয়। ছেলেবেলায় তার কালাজ্বর হয়েছিল। আজিজের বাবা আবার ছিলেন একজন কম্পাউন্ডার। মানে হাফ-ডাক্তার আর কি। তিনি তাঁর ডাক্তারি বিদ্যার পুরোটাই ঢেলে দেন ছেলের ওপর। উল্টোপাল্টা হাই পটেনশিয়াল এন্টিবায়োটিক আর ইনজেকশন গিলতে হয়েছিল তাকে। তারফলে তার দুর্ব্বোঘাসের মত কচি কচি চুলগুলো সেই যে ঝরে গেল, আর গজাল না। সেই থেকে মাথা একদম পরিষ্কার। তিরিশ বছরের তরতাজা যুবক। অথচ মাথায় একগাছা চুলুও নেই। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! এ নিয়ে আজিজের দুঃখের সীমা পরিসীমা নেই।

তা-ও হয়তো সহ্য করা যেত। কিন্তু বন্ধুরা তাকে দেখলেই তালুতে ‘তেরে কেটে তাক’ বাজিয়ে নেবেই। তখন ইচ্ছে হয় ওদের চুলগুলো উপড়ে নিতে। সবচেয়ে মর্মান্তিক ব্যাপারটা হয় যখন পাড়ার সুন্দরী মেয়েগুলো ওকে দেখলেই টাকের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে। তারপর খিলখিল হাসিতে গড়িয়ে পড়ে। সেইসব সময়গুলোতে আজিজের মনে হয় আত্মহত্যা করতে। দেখতে সে মোটেই খারাপ না। কিন্তু টাক সব বরবাদ করে দিয়েছে। হায়রে কপাল! আল্লাহ তাকে এত্তবড় একটা প্রেমিক হৃদয় দিয়েছেন। কিন্তু শর্ট পড়েছে চুলে। আহা রে! কয়েকগাছি চুল থাকলেও চলতো। মাঝে মাঝে মনে হয় বৌদ্ধ ভিক্ষু হয়ে যায়। কারন ওদের চুল রাখতে হয় না।

এই চুলের জন্য কত অষুধ যে আজিজ খেয়েছে, তার হিসেব নেই। ফলও যে হয় নি, তা নয়। তবে তা মাথায় নয়, বরং গায়ে। হরেক কিসিমের অষুধ খেয়ে তার হয়েছে বিবিধ এলার্জি। ইদানিং তার সন্দেহ হচ্ছে এইসব অষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় সম্ভবত গায়ের পশমও পড়তে শুরু করেছে।

এভাবেই কেটে যাচ্ছিল আজিজের দিন। দুঃখময় এবং উত্তেজনাহীন। নিয়তির প্রতি ক্রমাগত ছুড়ে দেওয়া আক্ষেপ কিন্তু একদিন ঠিকই লেগে গেল। একটি এক ঘটনা ঘটে যাওয়ার ফলে পুরো পাড়া জুড়ে বয়ে গেল বিশাল আলোড়ন।

একটি নতুন মেয়ে এসেছে পাড়ায়। আর এসেই পাড়া জুড়ে ঢেউ তুলেছে। অপরূপ রুপসী, তন্বী তরুনী। তার চলন বলন, হাসি, কথা বলার ভঙ্গি – সবই ঘায়েল করতে লাগল পাড়ার ছেলে-বুড়ো সবাইকে। তবে সবচেয়ে নজর কাড়ল যেটা সেটা হলো মেয়েটার মাথাভরা দীঘল কালো চুলের ঢল। বলতে গেলে চুলই চালমাত করে দিল। সবার মত আজিজও এই সবকিছুই লক্ষ্য করেছে। কিন্তু লজ্জায় সামনে যায় নি। আর যাবেই বা কোন মুখে? তার মাথা তো গড়ের মাঠ। এই টেকো মুন্ডু নিয়ে কিভাবে সেই চুলওয়ালীর সামনে যাবে সে? আজিজ এবার মরিয়া হয়ে উঠল। কাঁহাতক আর বাঁচা যায় চুল ছাড়া? কোন উপায়ই কি নেই? আজিজের ইচ্ছে হলো চিৎকার করে কাঁদতে এবং সত্যিই সে লুকিয়ে লুকিয়ে দুদিন চোখের পানি ফেলল।

এর মধ্যে আজিজ সেই রূপসীর নামটাও সংগ্রহ করেছে। অনিমা। আহা…! কি দারুন ছন্দময় নাম। আজিজ বার বার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে নামটা উচ্চারণ করতে থাকে। শুধু নাম জপাতেই এত আনন্দ! তাহলে কথা বলতে পারলে কি হবে? আজিজ আর ভাবতে পারে না।

মনের যখন এই রকম উথালপাথাল অবস্থা, তখন একদিন এক ঘটনা ঘটে গেল আজিজের জীবনে। বলা যায়, ভাগ্যদেবী সদয় হলেন তার ওপর। দাড়িওয়ালা বুড়োর ছদ্মবেশে তিনি আজিজের সামনে এসে দাঁড়ালেন ফার্মগেটের ওভারব্রীজের ওপর।

আজিজ যাচ্ছিল এক ডাক্তারের কাছে। চর্ম ও যৌন রোগের ডাক্তার। অবশ্য তার দরকার চুলের জন্য। মাত্র গতকালই বন্ধু আকরামের কাছ থেকে ঠিকানাটা পেয়েছে সে। হন হন করে হেঁটে যাচ্ছিল। এমন সময় দাড়ি আর জটা চুল নিয়ে জোব্বা পরা এক বুড়ো তার সামনে এসে মুঠো করা বাম হাতটা বাড়িয়ে দেয়।

“নে, তোর সব মুশকিল আসান হবে। নে।”

“কি নেব? কে আপনি?” থতমত আজিজের প্রশ্নের জবাবে মুঠো খুললো বুড়ো। মুঠোর মধ্যে একটা ছোট শিশি। হোমিওপ্যাথির শিশির মত দেখতে। তারমধ্যে গোটা দশেক কালো কালো বড়ি।

“এটা নে। একটা করে খাবি। প্রত্যেক পুর্ণিমার রাতে।” বলে উঠল বুড়ো।

বিস্মিত আজিজ জিজ্ঞেস করলঃ “খেলে কি হবে?”

“আবাদ হবে তোর মাথায়। ঘন চুলের আবাদ। চাস না?” বুড়োর প্রশ্ন।

“চাই। অবশ্যই চাই।” আজিজ বলে ওঠে।

সাধারণ সময় হলে আজিজ কখনই এ ধরনের বুজরুকিতে বিশ্বাস করত না। ধাক্কা দিয়ে বুজরুক বুড়োকে সরিয়ে নিজের গন্তব্যে চলে যেত। কিন্তু আজকের ব্যাপারটা ভিন্ন। সুন্দরী অনিমার চন্দ্রমুখ কল্পনা করে সে হাবুডুবু খাচ্ছে। আজিজ আর নিজেতে নেই। সে বুড়োকে জিজ্ঞেস করলোঃ

“কত দিতে হবে?”

“তোর কাছে যা আছে তাইই দে।”

সেদিনই আজিজ টিউশনির টাকা পেয়েছিল। সাড়ে সাত হাজার টাকা। পকেটে হাত ঢুকিয়ে আজিজ পুরোটাই বের করে বুড়োর বাড়ানো হাতে তুলে দেয়। আর তার হাতে চলে আসে টাকে চুল গজানোর ‘অব্যর্থ’ বড়ির শিশি।

বাড়ি ফিরে আজিই গুগল সার্চ দেয় কবে পূর্ণিমা সেটা বের করার জন্য। কি আশ্চর্য! আজ রাতেই পূর্ণিমা। ঠিক রাত ন’টায় আজিজ একটা বড়ি খেয়ে নেয়। হিসেব বলছে ছয় মাসে সবগুলো বড়ি শেষ হবে। নিশ্চয়ই বড়ির প্রভাব আগেই টের পাওয়া যাবে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আজিজ নিজের টাকের দিকে তাকিয়ে থাকে। কল্পনারা মাখা মেলার সাথে সাথে টাকে কুচকুচে কালো চুল গজিয়ে ওঠে। আর অনিমা এসে হাতটি ধরে দাঁড়ায়। উফ…! আজিজের সারা শরীর কাঁটা দিয়ে ওঠে আনন্দে।

সেই দিনের পর প্রায় চার সপ্তাহ কেটে গেছে। আর আজিজের জীবনে ঘটে গেছে চরম আশ্চর্যতম ঘটনা। অনিমার সাথে আজিজের পরিচয় ঘটে গিয়েছে। শুধু পরিচয়ই নয়, এত এত ছেলের মধ্যে বন্ধু হিসেবে সে আজিজের দিকেই হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। মিরাকল তাহকে ঘটে।

সেদিন বাড়ি ফিরে নিজের রুমে ঢুকে হঠাৎ আজিজের মনে পড়ল সেই অষুধের কথা। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আঁতিপাতি করে টাকটার সবদিক খুঁজে দেখল। চুলের নামগন্ধও নেই। মুহূর্তেই সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেল ওর কাছে। বুজরুকি। একদম ফ্রড। ধুরন্ধর বুড়ো ওকে একদম বুরবক করে ছেড়েছে। উফ..! এতবড় বোকা সে। ড্রয়ার খুলে শিশিটা বের করে সে। রাগে মাথা গরম হয়ে ওঠে। ইচ্ছে হয় ছুঁড়ে ফেলে দেয় জানালা দিয়ে। কিন্তু ফেলবার আগ মুহূর্তে হঠাৎ মনে হয়, কিনেছে যখন ফেলবে কেন? এক গ্লাস পানি দিয়ে সবগুলো বড়ি সে গিলে ফেলল ঢক করে। পয়সা কিছুটা তো উশুল হোক।

“শালা, এমন ঠক খেলাম।” আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই গাল দিতে থাকে আজিজ। ইশ…! আগে কেন অনিমার সাথে দেখা হলো না? তার এই টাকলা মাথা দেখেও তো অনিমা তাকে ভুল বোঝেনি। তাহলে তো সে আর ডাক্তারের কাছে দৌড়াতোও না, আর সেই বুড়োর খপ্পরেও পড়তো না। সবই কপাল। আচ্ছা, অনিমা কি দেখে আমাকে পছন্দ করলো? হঠাৎ ভাবনাটা এলো আজিজের মনে। যে কারনেই হোক, আল্লাহ তার দিকে মুখ তুলে চেয়েছে।

তন্ময় হয়ে এইসব ভাবছে, এমন সময় আজিজের মোবাইলের রিং বেজে উঠল। অনিমা ফোন করেছে। আজিজের হৃদপিন্ডটা উত্তেজনায় একটা লাফ দিয়ে ওঠে।

“হ্যালো, অনিমা। কিক কি ব্যাপার?” উত্তেজনায় আজিজ তোতলাতে থাকে।

“তুমি কাল দুপুরে ফ্রি আছ?” অনিমা জানতে চায়।

“আছি তো। কেন? কি করতে হবে?

“বাবা মা কাল দাদুকে দেখতে যাবে। আমি বাসাতেই থাকব। তুমি একবার আসতে পারবে আজিজ?”

“অবশ্যই। অবশ্যই।” আজিজ আবার তোতলাতে থাকে। এ কি সৌভাগ্য!

“ঠিক আছে। কাল দুপুরে দেখা হচ্ছে। বাই।” ফোন কেটে দেয় অনিমা।

ফোন রেখে আজিজ কিছুক্ষন থম মেরে থাকে। তারপর দুদ্দাড় করে বেরিয়ে যায় সেলুনের দিকে। উদ্দেশ্য দাড়ি কামিয়ে ফিটফাট হয়ে থাকা। যদিও কাজটা করার জন্য কাল সারা সকাল পড়ে আছে কিন্তু আজিজের আর তর সইছিল না।

দিনের বাকিটা সময় আর সমস্ত রাতটা কেটে গেল অনিমাকে নিয়ে নানা সম্ভব-অসম্ভবের কল্পনায়।

পরদিন দুপুর। সবচে সুন্দর জামা প্যান্ট পরে শেভ করা মসৃন গাল নিয়ে দুরুদুরু বুকে আজিজ দাঁড়িয়ে আছে অনিমাদের বাড়ির গেটে। কলিংবেল টিপতেই বাচ্চা চাকরটা নিয়ে গেল তাকে একদম ভেতরের বারান্দায়। সেখানে বেতের চেয়ারে অনিমা একটা হালকা সবুজ শাড়ি পরে বসে আছে। আজিজ বসলো আরেকটা চেয়ারে। আজিজের বুক ঢিপ ঢিপ করছে। অনিমার এত কাছে আগে আর আসেনি সে।

“কেমন আছ?” অনিমা জিজ্ঞেস

“ভাভ-ভালো” – উত্তেজনায় আজিজের গলাটা কেঁপে যায়। “তুমি কেমন আছ অনিমা?

“আমার মনটা নেই আজিজ। তাই তো তোমাকে ডাকলাম। যদি মনটা একটু ভাল হয় তোমার সাথে কথা বলে।” অনিমার স্বরটা কেমন যেন বিষন্ন শোনায়।

এমনিতেই বুকটা ধড়ফড় করছিল আজিজের। এটা শোনার পর মনে হলো হৃদপিন্ডটা ব্যাঙের মত লাফ দিয়ে গলার কাছে উঠে এসেছে। এ যে মেঘ না চাইতেই জল!

“তাই তো আমি চলে এসেছি। তুমি ডাকবে, আমি কি না এসে পারি?” বিহবল স্বরে আজিজ বলে ওঠে।

“কেন আসবে তুমি? আমি তোমার কে?” ব্যগ্র গলায় জিজ্ঞেস করে অনিমা। যেন এর উত্তরের ওপর ওর জীবন মরন নির্ভর করছে।

“আমি…আমি..তোমাকে ভালবাসি অনিমা। প্রথম দেখার দিন থেকেই। আজ বলে ফেললাম।” এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো উচ্চারণ করে আজিজ।

“তুমি যা বলছ, তা কি চিন্তাভাবনা করে বলছ? আমি যে রকমই হই, তুমি সারাজীবন আমাকে ভালবাসতে পারবে?”

এবার আজিজ বলে ওঠে, “কি বলছ তুমি? তোমার মত এত সুন্দর মেয়েকে কেউ ভালবাসতে না পারে? তুমি যেমনই হও, আমি সারাজীবনই তোমাকে ভালবাসব।”

“ঢ়িক আছে। তবে আমার যে রূপ তুমি দেখেছ, সেটাই সব নয়। আজিজ…আমি আসলে এই রকম।”

এটা বলেই অনিমা ওর দীঘল কালো চুলের গোছায় হাত দিল। আর তারপর আজিজের বিষ্ফরিত দৃষ্টির সামনে অনিমার হাতের হ্যাঁচকা টানে খুলে এলো সেই ‘বিশাল চুলের গোছা’। আজিজের সামনে এখন অনিমার সুন্দর মুখশ্রীর ওপত চকচকে একটা মসৃন নিটোল একটি টাক। বিষন্ন কন্ঠে অনিমা বলতে শুরু করলোঃ

“আমার যখন পাঁচ বছর বয়স, তখন একটা ভীষন অসুখে সব চুল পড়ে যায়। আর সেই চুল ওঠেনি। আমি তাই কারও সাথে মেশার সাহস করিনি কোনদিন। তোমাকে দেখেই আমার মনে হয়েছে, আমি এতদিনে এমন একজনে খুঁজে পেয়েছি যে কিনা ঠিক আমারই মত।”

অনিমা যখন এইসব বলে যাচ্ছে, তখন আজিজ তাকিয়ে আছে তার হাতের তালুর দিকে। সেখানে এই ক’ঘন্টার মধ্যেই একগোছা চুল উঁকি মারছে। আজিজ এখন জানে, অনিমার কথাগুলো হয়ত কাল পর্যন্ত ঠিক ছিল। কিন্তু আজ আর আজিজ অনিমার সাথী হতে পারবে না। কারণটা সেই বড়িগুলো। হায়রে! সেগুলো বুজরুকি ছিল না। একসাথে সবগুলো খাওয়ার পর এখন ওর সারা শরীরের সম্ভব অসম্ভব জায়গায় পশম গজাচ্ছে। শুধু হাতের তালুই নয়, মাথা, কপাল, কান – সবখানে কম্বলের লোমের মত বিনবিনে চুল বেরোচ্ছে। দু’এক দিনের মধ্যেই যে যে ইঞ্চিতিনেক লম্বা হয়ে যাবে সে ব্যাপারে সে নিশ্চিত।

আজিজ এখন জানে তার ‘টাকলা হাকিম’ নামটা চিরদিনের জন্য ঘুঁচে গিয়েছে। সে আর টাকলা নয়।

কাল থেকে ওর নাম হবে – পশমি হাকিম।

By | 2018-05-17T19:24:42+00:00 May 17th, 2018|ছোট গল্প|0 Comments

About the Author:

Leave A Comment

error: Content is protected !!