চিতাবাঘ এবং আদম সন্তান – অনুবাদকঃ ড. মো. নূরে আলম

Home/অনুবাদ/চিতাবাঘ এবং আদম সন্তান – অনুবাদকঃ ড. মো. নূরে আলম

চিতাবাঘ এবং আদম সন্তান – অনুবাদকঃ ড. মো. নূরে আলম

লেখক
নিজামী গাঞ্জাবি

সংকলক
মাহদি অযার ইয়াযদি

বহুদিন আগের কথা। একদিন একটি বিড়াল এক গ্রামবাসীর ঘর থেকে মাংস চুরি করেছিল। ঘরের মালিক লাঠি নিয়ে সেটাকে তারা করছিল আর বিড়ালটি পাহাড়ী এলাকার দিকে পালাতে লাগল। অন্য দিকে একটি চিতাবাঘ পাহাড়ী অঞ্চল থেকে আসছিল। পথিমধ্যে বিড়ালটির সাথে দেখা হল। দেখল, তার আকার আকৃতিতে চিতা বাঘের মত। কিন্তু তাকে ভয় পাচ্ছিল ও পলায়ন করতে চাচ্ছিল।

চিতাবাঘ বিড়ালকে ডেকে বলল, ‘ওহে, অপেক্ষা কর। তোমাকে দেখব’।
বিড়াল বলল, ‘মিউ’।
চিতাবাঘ বলল, ‘আহ, তার চিকন শব্দ দেখ। দেখি, তুমি কি আমাদের পরিবারের নও? তা হলে তোমার কেশর ও মোটা ঘার কোথায়। কেন কথা বলার সাহস নাই? কেন ভয় পাচ্ছ? কেন এরূপ দুর্বল ও ক্লান্ত? আমাদের পরিবারের লোকগুলোতো বেশ বড় হয়ে থাকে।’
বিড়াল যখন দেখল যে এমন কাউকে পাওয়া গেল যে তাকে শান্তনা দিচ্ছে, তখন তার কষ্টে চির ধরলো এবং কান্না জুড়ে দিয়ে বললো, তুমি জাননা যে আমরা কী বিপদে পড়েছি’।
চিতাবাঘ বলল, ‘আচ্ছা, কেঁদনা, কান্না তো দুধের শিশুর কাজ। এখন বল দেখি, কি বিপদ? নাকি এমন কোন শত্রু আছে যার সাথে শক্তিতে পার না?’
বিড়াল বলল, হায় যদি শত্রু হতো! শত্রুতো কিছুই না। জানতো শত্রু কুকুর, তার থেকে পলায়ন করি। কিন্তু আমাদের কষ্টের কারণ হলো আমাদের বন্ধুরাই।
চিতাবাঘ বলল, ‘বুঝলাম না, তোমার বন্ধু কে?’
বিড়াল বলল, ‘মানুষ’।
চিতাবাঘ বলল, মানুষ? মানুষ আবার কি ধরনের জিনিস? আমিতো এ পর্যন্ত তার নামও শুনিনি! মূলত তোমরা মানুষের সাথে কেন বন্ধুত্ব কর?
বিড়াল বলল, কসম খোদা, উপায় নেই। আমরাতো অন্য প্রান্তর থেকে উৎখাত হয়ে গৃহপালিত হয়েছি। এসে পড়েছি গ্রামে ও শহরে, আর মানব জাতির সাথে বসবাসে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি।
কিন্তু এ মানুষরা খুবই ভয়ংকর। তাদের জন্য শত্রু-মিত্র কিছুইনা! একদিন আমাদেরকে ইঁদুর ধরার জন্য ঘরে নেয়। যখন ইঁদুর পাওয়া না যায়, অন্য কিছু নিয়ে খাই তাতে খারাপ হয়। তাছাড়া মানবশিশুরাও আমাদের বাচ্চাদেরকে কষ্ট দেয়। আমরা যখন বাচ্চাওয়ালা হই তখন কোন ঘরেই শান্তি পাই না। জানি না, কি বলবো। দয়া ও ইনসাফ বলতে তারা কিছুই বুঝে না। আমরা এ মানুষগুলোর হাতে বড় কষ্টে কাটাচ্ছি। বিশ্বাস কর, তোমরা চিতাবাঘরাও যদি এ মানবজাতির হাতে আবদ্ধ হতে আমাদের চেয়েও বেশি দূর্ভাগ্য পোহাতে।
চিতাবাঘ বলল, এগুলোতো কথার কথা। তোমাদের নিজেদেরই ভুল যে, ভিক্ষাবৃত্তিতে অভ্যস্থ হয়েছ। নতূবা মানুষ হোক বা মানুষের দাদা হোক। কেন আমাকে কেউ বিরক্ত করে না! যদি আমি তোমার জায়গায় হতাম আর যদি কেউ তখন আমাদের উপর মাতব্বরী করতে চাইত, তাহলে তার থেকে মাথা নামিয়ে দিতাম। এখন যতক্ষণ পর্যন্ত আমার কাছে আছ দুঃখ করোনা দেখি, তুমি কি মানুষজাতি আমাকে দেখাতে পারবে? তাহলে আমি তার হিসাব নিয়ে ছাড়ব এবং তোমার প্রতিশোধ নিব।
বিড়াল বলল, অবশ্যই তোমাকে দেখাতে পারবো। তবে মানুষ জাতি খুবই ভয়ংকর। কেউ তার প্রতিদন্দ্বী হতে পারে না।
চিতাবাঘ বলল, ‘সেটা তোমার ব্যাপার নয়। সামনে চলো ও এ মানুষ জাতিকে খুজে বের করে আমাকে দেখাও, তাকে বিনাশ করবো।’
বিড়াল বলল, ‘চল, যাই। তবে নিজের দিকে লক্ষ্য রেখ’।
বিড়াল সামনে আর চিতাবাঘ পিছন পিছন এগিয়ে চললো। এক শস্য খামারে পৌছল। সেখানে এক গ্রাম্য লোক গাছের অসংখ্য ডাল কাটছিলো।
বিড়াল চিতাকে গ্রাম্য লোকটির কাছে এনে বলল, ‘এই হল মানবজাতি’। বিড়াল ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে এক কোনে দাঁড়াল।
চিতা তর্জন-গর্জন করে গ্রাম্য লোকটিকে বলল, ‘ওহে অভিশপ্ত শয়তান, যে নিজের নাম দিয়েছ মানবসন্তান! আমাদের স্বজাতীদেরকে বন্দি ও অপদস্ত করেছো?
গ্রাম্য লোকটি বলল, হ্যাঁ আমিই! তুমি কি কিছু বলতে চাও!
চিতাবাঘ বলল, তোমরা কোন অধিকারে বিড়ালদের উপর আধিপত্য বিস্তার করছো আর তাদের উপর অবিচার করছো?
লোকটি বলল, ‘মাতাব্বরী আমাদের অধিকার। আমাদের চিন্তাশক্তি আছে, জ্ঞান আছে, অভিজ্ঞতা আছে এবং আমরা সচেতন ও সতর্ক। বিড়ালতো সহজ ব্যাপার, আমরা সব জন্তুদেরকেই বন্দি ও অপদস্ত করতে পারি। এখন সেটা বিড়াল হোক কিংবা চিতা বা হাতি, যতই হোক না কেন। তবে আমরা বেবিচারী নই। অকারণে কারো সাথে আমরা কিছু করি না।’
চিতা বলল, ‘নিজেকে নিয়ে খুব বড়াই করছো। যদি সত্যিই বলে থাক তাহলে এখনই আমার একার জবাব দাও, তারপর অন্যদের। ইয়া আল্লাহ যুদ্ধ কর, যুদ্ধ করবো। আক্রমণ কর, আক্রমণ করবো। এখনই তোমার মাথায় বিপদ আনবো যাতে তোমার দাদাকে স্মরণ করো’!
গ্রাম্য লোকটি দেখল যে, বিপদ সন্নিকটে এবং চিতার সাথে শক্তিতেও পারবে না। চিন্তা করে বলল, ‘বেশ ভাল, যুদ্ধ করবো। কিন্তু শুনলাম যে তুমি খুবই সাহসী, জীব জন্তুদের মধ্যে কেউ চিতার সমকক্ষ নয়?’
চিতা নিজ প্রশংসায় আনন্দিত হয়ে বলল, ‘অবশ্য কাউকেই আমার চেয়ে বড় মনে করি না।’
লোকটি বলল, ‘বেশ ভাল। যে নিজেকে সবার থেকে বড় মনে করে তবে তার ইনসাফও বেশি থাকা উচিৎ। তার পৌরুষত্বও থাকা উচিৎ।’
চিতা বলল, এটা ঠিক। আমরা মানজাতির মত নই যে তাদের মত সবাইকে বন্দি ও অপমান করবো। আমাদেরকে বলা হয় চিতাবাঘ’।
লোকটি বলল, ‘আচ্ছা, যদি তোমার মাথায় বুঝের কথা ঢুকে থাকে তাহলে তোমার জানা উচিত যে, তুমি যুদ্ধের জন্য তোমার থাবা ও দাঁত সাথে এনেছ কিন্তু আমার শক্তি আমার সাথে নেই। এটা ন্যায় বিচার নয় যে, একজনের সাথে অস্ত্র আর অন্যজন নিরস্ত্র হয়ে শক্তি পরীক্ষা করবে!’
চিতা বলল, ঠিক আছে। তুমি তোমার শক্তি কোথায় রেখেছ?’
লোকটি বলল, ‘ঘরে’।
চিতা বলল, আচ্ছা, আমি এখানেই আছি। যাও, তোমার শক্তি নিয়ে এস’।
গ্রাম্য লোকটি অট্র হাসি হেসে বলল, ‘আশ্চার্য, তুমিতো খুব মজাদার প্রাণি’। তুমি এখানে এতসব শক্তি নিয়ে এসেছ। যখন বুঝলে একজন হৃদয়বান মানুষ ও সাহসী তোমার প্রতিপক্ষ, চাচ্ছ তার সাথে ফাঁকিবাজি করতে। আর আমি যখন আমার শক্তি আনতে যাব তখন তুমি পলায়ন করবে। মনে করছ আমি কিছুই বুঝি না? আমিতো বলেছি, আমাদের চিন্তাশক্তি আছে, জ্ঞান আছে এবং অভিজ্ঞতা আছে’।
চিতাবাঘ বলল, ‘আমরা পলায়নকারী নই’।
লোকটি বলল, ‘কেন, আমি জন্তুদেরকে ভাল করেই চিনি। তাদের সবাই মিথ্যাবাদী, তারা সবাই দুর্বলদের উপর আক্রমণ করে আর শক্তিশালীদের থেকে পলায়ণ করে। বিশেষকরে তুমিতো আবার বিড়ালদের দলীয় এবং আত্মীয়। বিড়ালরাও চুরি করে পালিয়ে যায়। আসলে জন্তুদের আত্মসম্মানবোধ এবং সম্প্রদায় বলতে কিছুই নেই।
কথাটি চিতার গায়ে লাগলো ও তিক্ত হয়ে বলল, ‘কেন অনর্থক অপবাদ দিচ্ছ? আমিতো এখানে আছি, তুমি কি চাচ্ছ আমি শপথ করে বলি পলায়ন করব না। চাচ্ছ অঙ্গীকার ও চুক্তি করি। অথবা তুমি যেভাবে চাও সেভাবেই করবো’।
লোকটি বলল, ‘শপথের দরকার নেই। জন্তুদের অঙ্গীকার ও চুক্তিনামার কোন মূল্যই নেই। যদি সত্য বলে থাক, যদি সাহস থাকে, ভয় না পাও, পালাতে না চাও, তাহলে আমি রশি দিয়ে তোমার ঘাড় এ গাছের সাথে বাঁধবো যাতে পালাতে না পার। আর আমি আমার শক্তি আনতে যাব। তখনই বুঝা যাবে বড়ত্ব ও মহত্ব কার অধিকার’।
চিতাবাঘ বলল, ‘আমি রাজী আছি’। গাছের কাছে গিয়ে দাড়াল আর গ্রাম্য লোকটি চিতার ঘাড়টি গাছের সাথে বাঁধলো এবং কোদালটি নিয়ে চিতার সামনে এসে বলল, ‘এখন বুঝেছো’?
চিতাবাঘ বলল, ‘কি বুঝবো?’
লোকটি বলল, ‘এটাই বুঝ যে, বন্ধি ও অপমান মানে কী! আর যতক্ষণ পর্যন্ত জীবিত থাকবে এ রশিটি তোমার ঘাড়েই থাকবে। যদি বিড়ালের ন্যায় নিরীহ হতে তবে শান্তিতে থাকতে, কিন্তু যখন তোমার শক্তি দেখাতে এসেছ তথনই হতভাগ্য হয়েছ।
চিতাবাঘ বলল, ‘তুমি তো তোমার শক্তি আনতে চেয়েছিলে’!
লোকটি বলল, আমার শক্তি হল আমার ভাষা। আর এ রশি ও এ কোদাল। যদি তোমাকে হত্যা করতে চাই তবে এ কোদাল দ্বারা তোমার কর্ম শেষ করব। তবে এমন এক কাজ করবো যা তোমাকে হত্যার চেয়েও নিকৃষ্ট হয়। তোমাকে নিয়ে খাঁচায় বন্ধি করে রাখবো যাতে মানুষ এসে তোমাকে দেখে বিদ্রুপ করে’।
চিতাবাঘ বলল, ‘তুমি চক্রান্ত করেছ। এটা ইনসাফ ছিল না’।
লোকটি বলল, ‘আমিতো তোমার খোঁজে পাঠাইনি। তুমি নিজেই এসেছ আমার সাথে যুদ্ধ করতে। যুদ্ধে মিষ্টি মধুর নয়, এটাই যুদ্ধ। এ কাজের নাম শত্রুতা নয়, বরং কর্মকৌশল। যে ভালো চিন্তা করে সে সফল হবে। আমিতো বলেছি, আমাদের চিন্তাশক্তি আছে, অভিজ্ঞতা আছে’।
তারপর গ্রাম্য লোকটি তার বন্ধুদেরকে সংবাদ দেওয়ার জন্য গেল যাতে তারা এসে চিতাবাঘকে জিবিত গ্রামে নিতে পারে এবং প্রদর্শনী করতে পারে।
চিতাবাঘ বিড়ালকে বলল, ‘খারাপ অবস্থায় পড়েছি’। মনে হয় তুমি মানবজাতীকে ভালই চিনেছ। এখন বল দেখি, যখন এ লোকটি চলে যায় তখন আমি যদি নিজের চিতার স্বভাবের বিপরীতে স্বরকে ছোট করতে চেষ্টা করি, তোমার ন্যায় মিউ মিউ করি, তাহলে হয়তো আমাকে ছেড়ে দিবে কি?
বিড়াল বলল, ‘অত্যন্ত দুঃখিত’। যদি প্রথমেই চিতাগিরি না করতে, মানবজাতির মিঠা কথায় বিভ্রান্ত না হতে তাহলে লাভ হতো। এখন তো খুব দেরি হয়ে গিয়েছে। এখন যদি ইঁদুরের থেকেও ছোট হও, যদি মিউ মিউ করার বদলে চিক চিকও কর তাহলেও কোন লাভ হবে না।

By | 2018-06-14T18:20:59+00:00 June 14th, 2018|অনুবাদ|0 Comments

About the Author:

Leave A Comment

error: Content is protected !!