এক টুকরো সুখ – ইফরাত আরা মুক্তি

Home/ছোট গল্প/এক টুকরো সুখ – ইফরাত আরা মুক্তি

এক টুকরো সুখ – ইফরাত আরা মুক্তি

ক্কাল সক্কাল কানের ধারে এতো ঘ্যানর ঘ্যানর ভালো লাগেনা। যা তো এহেন থাইকা। আমার বহুত কাম পইড়া আছো অখনো। তোর মতোন পোড়া কপালি মাইয়া জনম দিয়া যে কি ভুল অইছে তয় আর কি কমু। তোর জনমের পর যদি লবন মুহি দিয়া মাইরা ফেলাইতাম তাইলে তো তুইও বাঁইচা যাইতি আর আমিও বাঁচতাম। কি যে পাপ করছিলাম তোরে এই দুনিয়াতে আইনে…

বলতে বলতে শাহেদা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। কলতলায় বসে সে থালাবাসন মাজছিলো। তখন তার ১৭ বছরের প্রতিবন্ধী মেয়ে রুমা এসে আবদার করে ঈদের জন্য নতুন জামা কিনে দেওয়ার। গরীবের সংসার নুন আনতে পানতা ফুরায়। দুই তিন বাড়িতে কাজ করে মা মেয়ের পেট কোন রকম চলে। সে আবার নতুন জামা কেনার টাকা পাবে কোথা থেকে। কয়েক জায়গায় ছিড়ে যাওয়া শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের পানিটা মুছে আবার বলতে শুরু করে

হাতদূটো আল্লায়তোর নূলা কইরে পাঠাইছিলো তাও যদি তুই পোলা হতিস কইতাম যা রাস্তার ধারে বইসা ভিক্কে কইরা আন। মাইয়া হয়ে জন্মাইছিস। কেমনে তোরে ভিক্কে করতে কইতাম।। ভিক্কে করতে গেলে চাইরপাশে শিয়াল শকূনেরা যেমনে ওত পাইতে থাহে তাতে তোরে ছিইড়া খাইব। পোড়া কপালি। বাপটারে তো জন্মের পর খাইছোস। এহন আমারে খাইতে পারিস না। তাইলে এতো কষ্ট আমার করোন লাগতো না।

মাটির ঘরের বারান্দায় পা ঝুলিয়ে বসে বসে রুমা মায়ের সব কথা শুনতে পায়। মা যে তাকে বকছে এটা বুঝে সে কাঁদছে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। নতুন জামা সবাই কিনে আনছে বাজার থেকে। নতুন জামা পরতে কেমন লাগে তা আজও জানেনা রুমা। মানুষের দেওয়া পুরানো জামা পরে সে এতো বড় হইছে। তারও ইচ্ছা হচ্ছে একটা নতুন জামার। তার ইচ্ছাটায় তো শুধু তার মাকে জানিয়েছিলো। এতে এতো বকাবকির কী আছে তাইতো বুঝতে পারছে না রুমা।

গায়ে পায়ে সে এক যুবতি। শুধু হাত দুটো তার নূলা। একটা হাত শরীর থেকে এক বিঘত সমান নেমেছে। ১৩ /১৪ বছর পর্যন্ত ও তাকে খাওয়ানো থেকে শুরু করে শৌচ কাজও করিয়ে দিত শাহেদা। এখন নিজে তিন আঙ্গুল দিয়ে টুকটাক কাজ করার পদ্ধতি সে আবিষ্কার করেছে। বুদ্ধিশুদ্ধিও তার কম। তবুও সুখ দুঃখের উপলব্ধি করতে পারে সে। এই কেউ বেশি কথা বলছে তো কেঁদে কেটে অস্থির। চার বছরের বাচ্চার মতো সে হুহু করে কাঁদে। কিছুসময় পর আবার সব কিছু ভুলে হেসে কুটি কুটি হয়। একরকম বুদ্ধি প্রতিবন্দিও বলা যায় তাকে।

থালাবাসনগুলো রান্নাঘরের বারান্দায় রেখে শাহেদা রুমার কাছে গিয়ে বলে হয়ছে বহুত কাঁনছো অহন চলো দেহি কামে যাই। বেলা গড়াইয়া যাইতেছে। অহন কামে না গেলে কাম সারতে সারতে বেলা পইড়ে যাবে। সামনে ঈদ। হগ্গোল বাড়ি এহন কাম কাজ বেশি।

শাহেদা কাজে যাওয়ার সময় সর্বদা রুমাকে সাথে করে নিয়ে যায়। কি করবে মেয়েটারে একা বাড়িতে রেখে গেলে শিয়াল কুকুরের জিহ্বা দিয়ে লালা ঝরে। এইতো ক’বছর আগে একদিন সে রুমাকে বারান্দায় বসিয়ে রেখে পাশের বাগান থেকে কাঠখড়ি কুড়াতে গেছিলো। বাড়িতে ফিরে দেখে মেয়ের হাতে চকলেট আর তার ওড়না ধরে টেনে ঘরের দিকে নিতে চাইছে গ্রামের মাতবর মোতালেব মোল্লা। শাহেদা দৌড়ে বটি নিয়ে আসতেই মোতালেব এক ছুটে পালিয়ে চলে যায়। মোতালেবের বাড়িতেও শাহেদা কাজ করতো। তারপর একদিন চুরির অভিযোগে কি অপমানটাই না করে বাড়ি থেকে তাকে বের করে দেয় মোতালেব মোল্লা। শাহেদা আল্লাহর কাছে শয়তানটার বিচার দিয়ে রাখছে। তাছাড়া আর উপায় তো নাই।

এ পাড়ায় নতুন এক ভাড়াটিয়া আসছে বড়বাড়িতে। তাদের ঘরে শাহেদা দু’মাস কাজ করে। প্রতিদিন রুমাকে সাথে নিয়ে যায় সে। ভাড়াটিয়া বউটা খুব ভালো। মাঝে মাঝে সে রুমাকে এটা ওটা খেতে দেয়। রুমা চুপচাপ সিঁড়ির পাশে বসে থাকে। শাহেদা সব কাজ শেষ করে ওকে নিয়ে আবার বাড়ি ফেরে। আজ কাজ করতে এসে দেখে বাড়িতে বেশ ভিড়। ২৭ রমজান আজ। শাহেদার মনে পড়লো ভাড়াটিয়া বউটা আশেপাশের গরীবদের আজ আসতে বলেছিলো যাকাতের শাড়ি লুঙ্গি দেওয়ার জন্য।

শাহেদার মনটা খারাপ হয়। তার জন্যেও হয়তো একটা শাড়ি কিনছে। তারে শাড়িটা না দিয়ে যদি রুমার জন্য একটা জামা কিনে দিতো তাহলে সে খুবই খুশি হতো। মনে মনে ঠিক করলো শাড়িটা নিয়ে তার খালাতো বোনের কাছে বিক্রি করে রুমারে একটা নতুন জামা কিনে দেবে। এর আগেও সে যাকাতে পাওয়া শাড়ি বিক্রি করেছে তার খালাতো বোনের কাছে। মুখ ফুটে যদি ভাড়াটিয়া বউকে বলতো তাকে শাড়ি না দিয়ে মেয়েটাকে জামা কিনে দিতে তাহলে হয়তো বউটা না করতো না। কিন্তু গরীব হইলেও সে কোনদিন কারো থেকে কিছু চেয়ে নেয় নাই।

ভাড়াটিয়া বউটা সবাইকে শাড়ি বিলিয়ে দিয়ে শাহেদার হাতেও একটা শাড়ি দেয়। শাড়িটা সিঁড়ির পাশে রেখে শাহেদা বাড়ির ভিতরে কাজ করতে যায়। মনটা তার খুব খারাপ হয়। কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারেনা। সে বিশ্বাস করে গরীবদের মন থাকতে নেই। তাই একমনে সব কাজ শেষ করে মেয়ের কাছে ফিরে আসে। এসে শাহেদা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।

রুমার কোলের উপর রাখা একটা নতুন জামা। রুমা হাসছে আর হাত দিয়ে জামাটার এক কোনা তিনটা আঙ্গুলের সাহায্যে টেনে এনে নাকের কাছে ঘ্রাণ নিচ্ছে। শাহেদাকে দেখে চেঁচিয়ে বলছে মা মা দেখো আমার ঈদের জামা। কি সুন্দর খুশবু জামাটায়! এটা আমার জামা। আমার ঈদের জামা।

শাহেদা দাঁড়িয়ে মেয়ের খুশিতে উজ্জল হওয়া মুখটা দেখছে। চোখ দিয়ে তখন তার বের হচ্ছে আনন্দের অশ্রু। মুখের কোনে তার ফুটে উঠেছে বাঁকা চাদের মতো এক টুকরো হাসি। মনে মনে ভাবছে কখনো কখনো একটুখানি সুখ এনে দেয় পৃথবী জয়ের আনন্দ।

By | 2018-06-14T19:21:50+00:00 June 14th, 2018|ছোট গল্প|0 Comments

About the Author:

Leave A Comment

error: Content is protected !!