একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের রমজান মাস – নাহিদ হাসান নিবিড়

Home/ছোট গল্প/একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের রমজান মাস – নাহিদ হাসান নিবিড়

একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের রমজান মাস – নাহিদ হাসান নিবিড়

বিছানায় শুয়ে ছটফট করছে কলি।
রাত দশটা বেজে গেল এখনও লোকটা আসছে না কেন?
অফিস থেকে ফির-তেতো কখনো এতো দেরি হয়না। কি হলো ওর, ফোনও ধরছেনা?
রাস্তায় কোন সমস্যা হলোনা তো?
কলিং-বেল বাজতেই দৌড়ে এসে দরজা খুলে দরজার একপাশে দাড়াঁলো কলি।
প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে দরজা খুলতেই গালটা একটু টেনে দিয়ে অফিসের ফাইলগুলো কলির হাতে দিয়ে জুতোর ফিতা খুলে ঘরে যায় সুমন।
আজ দরজা খুলতেই সে জুতো না খুলেই কোন কিছু না বলে গোমড়া মুখে ভেতরে চলে গেল। একটা কথাও বলল না।
কি হলো লোকটার? সেতো কখনো এমন করেনা, একটা কথাও বললনা কেন? সে কি তবে কোন কারনে রেগে আছে? কিন্তু রাগ করার মতন তো সে কিছু করেনি, তাহলে রাগ করবে কেন? নাহ কিছু একটা হয়েছে, কিন্তু কি হয়েছে?
দরজা বন্ধ করে চায়ের পানি বসিয়ে দিয়ে ঘরে এলো কলি।
সুমন ঘরে এসেই বারান্দায় চলে গেছে, একটা সিগারেট জ্বেলে কি চিন্তায় যেন ডুবে আছে।
কি নিয়ে সে এতো চিন্তা করছে? কেন সে কিছু বলছেনা?
প্রতিদিন ঘরে এসে কাপড় ছেড়ে চা চায় সুমন। আজ তাও চাইলো না। শরীর খারাপ করল নাতো?
বারান্দায় যেয়ে কলি জিজ্ঞেস করলো কি হয়েছে তোমার? শরীর খারাপ করেছে?
সুমন কোন কথা বলল না, সে চুপচাপ কিছুক্ষণ পর পর সিগারেটে একটা করে টান দিচ্ছে, কলির দিকেও একবারও তাকিয়ে দেখল না।
কলির চিন্তা আরও বেড়ে গেল, কি হলো লোকটার কিছু বলছেনা কেন? সে কি কিছু ভুল করেছে? যদি তেমন কিছু করেই থাকে তাহলে তা বলবেনা কেন?
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে উত্তর না পেয়ে রান্নাঘরে চলে গেল কলি, চা বানিয়ে নিয়ে এসে সুমনকে দিয়ে আবারও জিজ্ঞেস করল, কি হয়েছে তোমার?
এবারও কোন কথা বলছেনা সুমন।
সুমন এরকম এর আগে কখনো করেনি, ঘরে এসে কতরকম গল্প করে লোকটা। বিয়ের পর থেকে কখনো স্বামীর সাথে কখনো মনমালিন্য হয়নি, আজ যেন সে একদম অপরিচিত কেউ। ভাবতে ভাবতে চোখের কোনে জল এসে গেছে কলির।
সে এবার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল- আমার কি কোন ভুল হয়েছে? আমিকি কোন ভুল করেছি? দ্যাখো আমি যদি কোন ভুল করে থাকি তাহলে আমাকে বলো, এভাবে চুপ করে থেকোনা। উত্তর পাবার আশায় সে নীরব দৃষ্টিতে তাকাল সুমনের দিকে।
সুমন এবার মৃদু স্বরে বলল কিছু হয়নি।
কলির বুকটা এবার ধড়ফড় করে উঠল, কিছু একটা যে হয়েছে সে তা বুঝতেই পারছে, তবে সে তা লুকবে কেন? তার কাছে কি এমন আছে তার লুকবার? যত যাই হোক একবার সে তাকিয়েও দেখবে না? দুচোখ থেকে টপটপ করে জল পড়ছে কলির। সে আর সইতে পারছেনা।
মিনতির সুরে বলল- দ্যাখো আমার যদি কোন ভুল হয়ে থাকে, আমি যদি তোমায় কোন কষ্ট দিয়ে থাকি তাহলে আমি ক্ষমা চাইছি তোমার কাছে, মাফ করে দাও, তবুও মুখটা এমন গোমড়া করে রেখ না।
চায়ের কাপ রেখে কলির হাত ধরে ফেলল সুমন, দ্রুত বলতে শুরু করলো আজ মাসের ২০ তারিখ। গতমাসের টাকা প্রায় শেষ, হাজার খানেক টাকা মাত্র আছে, তা দিয়ে কিভাবে কি করবো?
রোজা শুরু হয়ে গেছে, যেই বেগুনের দাম রোজার আগেও ৪০টাকা ছিল তার দাম এখন ৯০টাকা, দুধ, কলা, সবজি, মাংস সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে।
শিউলির স্কুলের বেতন জমে গেছে, কিশোরের দুধ, মা-বাবার ঔষধ, বাজার এসব কি করে করবো? বসকে আজ বললাম বেতনের কিছু দিতে সে দিলনা।
কলি সুমনের মাথায় হাত রেখে বলল, ওসব নিয়ে এতো ভেব না, একটা ব্যবস্থা ঠিক হয়ে যাবে।
সুমন আবারও বলতে শুরু করলো, তিনটা রোজা চলে গেল বাজার করতে পারলাম না। বাবা-মা সারাদিন রোজা রাখে, শিউলি পর্যন্ত রোজা রাখে, অথচ তোমাদের জন্য একটু ভাল বাজার করতে পারছিনা, অথচ প্রতিদিন অফিস থেকে ইফতারের সময় কতরকম খাবার দেয়, ওইসব খাবার আমার মুখ দিয়ে ঢোকে না। তারপরও স্বার্থপরের মতন একা একা তোমাদের ছাড়া খেয়ে নেই, আমার মেয়েটা এতো ছোট হয়েও রোজা রাখে, ওসব খাবার যখন খাই তখন জানো ওর মুখটা বার বার আমার সামনে ভেসে আসে, আপেল, আঙ্গুর ও কতো পছন্দ করে অথচ বাবা হয়েও আমি ওসব এনে দিতে পারিনা, স্বার্থপরের মতন একা একা খাই। আমাকে তোমরা মাফ কোরও।
কলি ঘরে গিয়ে আলমারি থেকে ৪হাজার টাকা এনে সুমনের হাতে দিয়ে বলে, এসব নিয়ে এতো চিন্তা করছ কেন, এই নাও এগুলো দিয়ে কিছু বাজার কোরো।
সুমন এবার কলির দিকে তাকিয়ে সবিস্ময়ে জিজ্ঞেস করে, তুমি টাকা পেলে কোথায়?
– বারে তুমি আমায় প্রতিমাসে কিছু টাকা দাওনা খরচের জন্যে, আমার তো অতো টাকা লাগেনা। জমতে জমতে হয়ে গেছে।
সুমনের বুকের গভীরে কেমন যেন একটা অনুভূতি কাজ করে, কলির হাত ধরে বাচ্চাদের মতন সে কাঁদতে শুরু করে।
এই কান্না কষ্টের নয় এই কান্না ভালোবাসার।

By | 2018-06-05T14:24:56+00:00 June 1st, 2018|ছোট গল্প|0 Comments

About the Author:

Leave A Comment

error: Content is protected !!