আমার রবীন্দ্রনাথ – শেলী জামান খান

Home/প্রবন্ধ/প্রবন্ধ/আমার রবীন্দ্রনাথ – শেলী জামান খান

আমার রবীন্দ্রনাথ – শেলী জামান খান

আমাদের বাঙালী মানসিকতায় কোন বড় মাপের মানুষকে নিয়ে কথা বলা, বা তাঁর মূল্যায়ন করতে যাওয়ার বিড়ম্বনা কিন্তু অনেক। কারন এ হলো বিশ্বাস, ভক্তির আর পূজার দেশ। রবিবাবুর প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর ব্যপারে আমার মাঝে মাঝেই মনে হয়, ফুলের মালায়, ধূপের ধোঁয়ায় আর পূজায় আমাদের ভালবাসার রবিবাবু যেন ঢাকা পড়ে যাচ্ছেন। পূজায় আর ভক্তিতে রক্তমাংসের একজন মানুষকে দেবতার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। একজন কবি, লেখক বা মানুষ রবীন্দ্রনাথকেই আমি বার বার জানতে চাই, বুঝতে চাই। ভালবাসি। ঋষি বা অলৌকিক মানুষ বলে দূর থেকেই শুধু ভক্তিভরে প্রণাম করে সভয়ে কখনো দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে চাইনি, আজও চাইনা।

আমার মানসপটে, আমার অন্তরে একজন রবীন্দ্রনাথের কথা যখন মনে পড়ে তখন আমার মনে ভক্তি নয় ভালবাসার অনুভূতি কাজ করে। আমার মনের গহীনে, হৃদয়ের মাঝে একজন খুব কাছের, খুব আপন কেউ যেন বাস করে। পূর্ব বাংলার পাতিসর, শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে, পদ্মার বুকে বোটে যে রবীন্দ্রনাথের জন্ম হয়েছিল, সেই রবীন্দ্রনাথ যেন আমাদের খুব কাছের একজন মানুষ । কুঠিবাড়ির রবীন্দ্রনাথ যেন আমার প্রাণের রবি। ইন্দিরা দেবীকে লেখা তাঁর ” ছিন্নপত্র ” যতবারই পড়ি আমার কেবলই মনে হয় পূর্ববাংলায় না এলে আর পদ্মার বুকে ভেসে না বেড়ালে রবীন্দ্রনাথ কি এই মন উজার করা চিঠিগুলো তাঁর ভালবাসার মানুষটিকে লিখতে পারতেন? না আমরা এই রবীন্দ্রনাথকে পেতাম?

আমার প্রাত্যহিক জীবনে যে মানুষটি আমাকে প্রতিদিন বাঁচতে শেখায়, মানুষকে ভালবাসতে শেখায়, প্রকৃতিকে ভালবাসতে শেখায় সেই মানুষটি আজও রবীন্দ্রনাথ। শূন্যতা, শোক, অভাব, আঘাত সব কিছুর উর্দ্ধে উঠে কিভাবে আনন্দকে উপভোগ করতে হয়, বেঁচে থাকতে হয় রবিবাবু যেন তাঁর জীবন দিয়ে, লেখনী দিয়ে আমায় তা বলে যান। মানুষ রবি, সংসারী রবি, স্বামী রবি বা বাবা হিসেবে রবির অনেক ভুল, অনেক ব্যর্থতা আমাকে পীড়া দেয়। তাঁর ব্যাক্তি জীবনের অনেক কাজ, সিদ্ধান্ত, বিবেচনাবোধ আমাকে ব্যথিত করে। কিন্তু দিন শেষে একজন বড় কবি, লেখক, গায়ক পরিচয়ের বাইরে তিনিও যে একজন সাধারন মানুষ ছিলেন তাঁর সীমাবদ্ধতাগুলোই তা আমাদের বলে দেয়। তাই রবীন্দ্রনাথ আমার কাছে পূজার নয়, ভালবাসার কবি।

মন খারাপ, আনন্দ, বা বিরহে যখনই আমি রবিবাবুর গান শুনি, তখন আমি প্রতিবারই ভাবি, একই গান যেন বার বার আমাকে একেকভাবে বাঁচতে শেখায়। দুঃখের দিনে এক ভাবে মনে গভীর শান্তি আর সান্ত্বনা এনে দেয়। আবার আনন্দের সময় যেন সেই একই গান আমার মনে আনন্দের এক আবেশ এনে দেয়। একই গান যেন অন্যভাবে, নানাভাবে, নানা মাত্রা পায়। তাই আজও রবীন্দ্রনাথ আমার অনুপ্রেরণার উৎস।

রবিবাবু, আমার কেউ নয়। কিন্তু তারপর সেই-ই আমার জীবনে নানাভাবে যেন জড়িয়ে আছে। তিনি আমার একান্ত নিজের রবিবাবু। নিজের মত করে আমি তার সাথে কথা বলি, নিজের মত করে তার কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পাই।নিজের মত করে তার লেখা পড়ে আনন্দ পাই। ছোট্টবেলা থেকেই রবিবাবুর কথা শুনতে শুনতেইতো বড় হয়েছি। মনে পড়ে, আমার তখন বারো বা তের বছর বয়স। বাসায় ছিল রবীঠাকুরের বইয়ে ঠাঁসা। আমার বাবা লাইব্রেরী থেকেও অনেক বই নিয়ে আসতেন। আমি একটু একটু করে পড়া শুরু করলাম রবীন্দ্রনাথ। তারপর গোগ্রাসে পড়ে ফেললাম কত কত তার লেখা কবিতা আর গল্প। বিভোর হয়ে শুনলাম তাঁর গান। সেই বইটির নাম এখন আর মনে নেই, কিন্তু সচিত্র সেই বইয়ে সুদর্শন যুবক রবিবাবুর ছবি দেখে তার প্রেমে পরে গেলাম। জানলাম আনা তড়খড়ের কথা। জানলাম কাদম্বরীর কথা। তাঁর প্রেম, বিরহের কথা। তারপর আফিম খেয়ে আত্মহত্যার কথা। আমি সেই কিশোরী বয়সে মনে মনে কাদম্বরী হয়ে রবিকে যেন আরো ভালবেসে ফেললাম। তাই তখন যেমন ছিল, আজও রবীন্দ্রনাথ আমার কাছে একজন রক্তমাংসের মানুষ বা ব্যক্তি হিসেবেই ভীষণ প্রিয়, আপন বা প্রাণের কবি।

“দেখেছি আমার হৃদয় রাজারে—-!”

সেই বড় বড় কথা বলা দুটো চোখ, মাঝখানে সিঁথি কাটা পরিপাটি বাবরি চুল। দৃঢ়বদ্ধ ঠোঁট । লম্বা সুঠাম দেহ। এই সুদর্শন মানুষটি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন বহুদিন। কিন্তু আমার চিন্তা, চেতনায় যেন খুব ভীষণভাবে বেঁচে রইলেন রবিবাবু। সেই কিশোরীবেলা থেকে আজ অব্দি, এই মধ্যবয়সে এসেও এই মানুষটি যেন আমার প্রাত্যহিক জীবনে অবিরত আমাকে প্রভাবিত করে আসছেন। এটা যে রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে আমার কত বড় পাওয়া, তা বলে বোঝাবার নয়।

রবিবাবুর মতই ব্যক্তিগত ঈশ্বর ভাবনা আমাকে মাঝে মাঝে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে। যেমন, বিশাল প্রকৃতি, পাহাড় বা সাগর এসব কিছুর সামনে দাঁড়ালে ভীষনভাবেই নিজেকে নিঃস্ব বা ভীষণ ক্ষুদ্র মনে হয়। এই সুন্দর সবুজ পৃথিবীর মুখামুখি দাঁড়ালে বুকের গভীরে একটা শিহরণ ওঠে। অজান্তেই চোখ জলে ভরে যায়। এই বিশাল সৃষ্টির পেছনে যে স্রষ্টা তাঁর প্রতি মাথা নত হয়ে আসে। আমার ব্যক্তিগত হতাশা, ব্যর্থতা আর পাওয়া না পাওয়ার বেদনা রবিবাবুর গান যেন আমাকে ভুলিয়ে দেয়। তাঁর গান, কবিতা যেন আমায় আমার ব্যক্তিগত ব্যথাকে তুচ্ছ করে দেয়। মনের মাঝে খুব বড় ধরনের উদারতা এনে দেয়। তাঁর গান আর কবিতায় যেন আছে ভাবনার অসীম সুযোগ আর অপার স্বাধীনতা। কখনো মনে হয় প্রেমিকার কাছে প্রেম নিবেদন, আবার কখনো মনে হয় স্রষ্টার কাছে নিবেদন। কখনো ভক্তি , কখনো ভালবাসা। সবই মনের খেলা। নিজেকে উজার করে দেয়া। আর সেটাইতো প্রকৃত মুক্তি।

প্রাত্যহিক জীবনে আমার ঈশ্বরভাবনা আমাকে মাঝে মাঝে খুব বিব্রত করে। কিন্তু রবিবাবুর গান যেন আমাকে কোন এক বিশাল কিছুর সাথে, কোন চিরন্তন সত্যের সাথে মুখোমুখি করে দেয়। যেন এক গভীর জীবনবোধের সাথে পরিচয় করে দেয়। তাই রবিবাবুর কাছে আমার কৃতজ্ঞতার কোন শেষ নেই।

আমি তাই ভালবাসি, ভীষণভাবে আজও ভালবাসি রবীন্দ্রনাথকে। সে আমার পথচলার সাথী। আমার আশ্রয়। আমার বেঁচে থাকার প্ররণা। সে আমার রবীন্দ্রনাথ!

By | 2018-05-16T19:30:23+00:00 May 16th, 2018|প্রবন্ধ|0 Comments

About the Author:

Leave A Comment

error: Content is protected !!