আমার বাবা’ বহুমাত্রিক লেখক কবি সাহিত্যিক সাংবাদিক -সাযযাদ কাদির- চমন স্যাব্রিনা

Home/স্মৃতি কথা/আমার বাবা’ বহুমাত্রিক লেখক কবি সাহিত্যিক সাংবাদিক -সাযযাদ কাদির- চমন স্যাব্রিনা

আমার বাবা’ বহুমাত্রিক লেখক কবি সাহিত্যিক সাংবাদিক -সাযযাদ কাদির- চমন স্যাব্রিনা

আমার বাবা দেশের খ্যাতিমান লেখক সাহিত্যিক …পাশাপাশি বিশিষ্ট সাংবাদিকও ছিলেন ।

লেখকদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষের নানা ধরনের চিন্তা চেতনা কাজ করে …যেমন : লেখক মানেই উদাসীন, এদের ভীতরে সামাজিকতা কম , আড়ালে কিংবা নিভৃতচারী হন…সাংসারিক জগতে মায়া মোহ কম …ইত্যাদি নানান ধরনের ভাবনার বিভ্রাট!

এইসবই ছাপিয়ে আমার বাবা কখনোই এমন ছিলেন না । এতটা বন্ধুত্ব সুলভ এবং উদার মনের বাবা সম্ভবত তখনকার দিনে সন্তানদের সাথে বাবাদের ছিলো না । সম্পর্কে গাম্ভীর্য ও সম্মানটাই ছিলো বেশি কিংবা বলা চলে মূখ্য …!

আমি মেজো সন্তান এবং প্রথম কন্যা সন্তান ছিলাম । দেখতে সবাই বলতো হুবহু আমার বাবার মতোই ..তাই বাবার কলিজার টুকরো ছিলাম বলা চলে । লেখক বাবা ..আর সাধারণ বাবার গাম্ভীর্য ছাড়িয়ে আমার বাবা ছিলেন অসাধারণ বাবা ..প্রিয় বন্ধু ও সবচেয়ে আপন…হৃদয়ের সবচেয়ে কাছের । আমিও বাবা ছাড়া কিছুই বুঝিনি কখনো ।

তখনকার সময় লেখকরা টাকা পয়সায় সমৃদ্ধশালী ছিলেন না তবে আমার বাবা লিখালিখির পাশাপাশি সাংবাদিকতা পেশা হিসেবে নিয়েছিলেন এবং সেই সুবাদে আমাদের চীনে থাকার সৌভাগ্য হয়েছিলো । আমার বাবা সৎ ছিলেন এবং নিষ্ঠাবান …
নিজের লিখার সাথে এবং কাজের সাথে তার দক্ষতা ও সততা তখন সর্বজনীন স্বীকৃত । বাবার চাকরির কল্যাণে ছোটবেলার পনে তিন বছর চীনের পিকিং শহরে কেটেছিলো যা বর্তমানে বেইজিং নামে সমাদৃত ।

বাবার সাথে কাটানো চীনের স্মৃতিকথা আজ তুলে ধরছি…

খুব চমৎকার সময় কেটেছিলো আমাদের চীনের পিকিং শহরে । বাবা রেডিও পিকিংএ কাজ করতেন পাশাপাশি আমার মা’ও । আমার মা রেডিওতে খবর পড়তেন আর বাংলা ভাষার কাজে দ্বায়িত্বরত ছিলেন। দিনের একটা বড় সময় আমরা তখন সেইখানকার স্কুলে পাড় করেছি । অনেক ছোট ছিলাম তাই স্কুলে পড়াশোনা তেমন কিছু ছিলো না তবে নানা ধরনের খেলাধূলা ও আনন্দফুর্তির মধ্যে দিয়ে আমাদের দিন কেটে যেতো । অল্প কিছুদিনে আমি ও আমার অপর দুই ভাই বোন স্কুলের সাথে আর চাইনিজ বাচ্চাদের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলাম.. পাশাপাশি দিব্যি বাংলা ভাষা ভুলে চাইনিজ ভাষায় কথোপকথন শুরু করে দিলাম ।
তখন চাইনিজ ভাষায় সারাদিন চে চু করতাম যদিও এখন আর কিছুই মনে পড়ে না । এর বিশেষ কারনও ছিলো । আর তা হল আমার বাবা ।
আগেই বলেছি আমার বাবা ছিলেন যুগের চেয়ে শতগুন আধুনিক ও বন্ধুত্ব সুলভ পিতা ।
আমরা যেখানে থাকতাম সেখানে বিশাল ভবনে উনচল্লিশটা দেশের মানুষের বসবাস ছিলো । আর এদের সবার সাথেই আমার বাবা মা বিশেষ করে আমার বাবার খুব চমৎকার সম্পর্ক ছিলো কারনটা অবশ্যই ভাষা । আব্বা ইংরেজি ও চাইনিজ দুটো ভাষায় তখন দক্ষ বলা চলে । তাইতো স্কুল থেকে বাসায় ফিরার পরও আব্বা খুব আহ্লাদ করে আমাদের সাথে চাইনিজ ভাষায় কথা বলতেন ।

আব্বার সাথে আমার চমৎকার বন্ধুত্বের ছোট্ট উদাহরণ হচ্ছে ..ঐখানে প্রায়ই বিভিন্ন ধরনের পার্টি হতো । আমরা সবাই কমবেশি যেতামই কিন্তু আব্বার নিত্য সঙ্গী ছিলাম আমি যেনো এত ছোট্ট আমি তবুও আমাকে ছেড়ে আব্বার কোথাও যাওয়া অসম্ভব!
আমি খুব মিশুক স্বভাবের ছিলাম এবং ঐখানে সবস্হানে সবার খুব প্রিয় ছিলাম ঠিক যেনো আব্বার মনের মত কন্যা আমি । সবাই আমাকে পছন্দ করে এটা নিয়েও বেশ একটু গর্ব ছিলো আব্বার ।

আব্বা সব রঙে মিশে যেতে পারতেন পাশাপাশি আনন্দ ফুর্তি করতেও..
আমিও ঠিক তেমনই ছিলাম । আমি সবার সাথেই বিশেষ করে লিফটম্যান থেকে পাইলট …সবার সাথেই সেই ছোট্ট বয়সে যেচে পড়ে কথা বলেছি ..মিশেছি ।

সাধারণ জীবিকার লেখক পিতা আমাদের কখনোই টাকা পয়সার কারনে কোনো ধরনের সুখ থেকে বঞ্চিত করেননি বরং যখনই সুযোগ এসেছে আমাদের বিভিন্ন স্হানে ঘুরিয়েছেন…
হংকং,ব্যাংকক…রেংগুন সহ ..চীনের বিখ্যাত সব দর্শনের স্হানে তিনি আমাদের সেই স্বল্প সময়ে ঘুরিয়েছিলেন । বড় বড় ফাইভ’স্টার হোটেলে রেখেছেন…সেইখানকার সব নামকরা হোটেলে খাইয়েছেন বিশেষ করে আমার জন্য । বিদেশী খাবারের প্রতি আমার খুব আকর্ষণ ছিলো যা ঐসব বড় বড় হোটেলেই পাওয়া যেতো কিন্তু আব্বা কখনোই টাকার কথা ভাবেননি ….টাকা জমানো তো দুর ..সাধ্যের বাইরে খরচ করে সব উজার করেছেন ।

আব্বার কল্যাণে প্রথম চীনের মহাপ্রাচীর দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল যা সপ্তম আশ্চর্যের এক আশ্চর্য! প্রথম মিকিমাউসের ঘড়িও আব্বাই হংকং থেকে আমাদের কিনে দিয়েছিলেন । বড় বড় হোটেলে চমৎকার সব পার্টিতে আব্বার সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা নাচার সেই দিনগুলো আজো হৃদয় হরণ করে । বাবার হাত ধরে বিখ্যাত সব স্হানে ঘুরার মজার স্মৃতি গুলো আজো অক্ষত!

বাবার সাথে ফেলা আসা এমন অজস্র স্মৃতি আজো হৃদয়ে অক্ষত । সেটা যেনো না ভুলা আমার কোনো স্বপ্ন রাজ্য আর আমি হয়ত ছিলাম তার রাজকন্যা …

সত্যিই মেয়েরা ততদিনই রাজকন্যা ..
যতদিন তার পিতার গৃহে !

আজ আমার বাবাকে খুব মনে পড়ছে …

এই তো সেদিনই… ঈদের দিনে রাস্তার পাশে দোকানে আমাকে নিয়ে দাড়িয়ে কোক খাচ্ছেন আমার বাবা …বেশ ইয়াং আর সুদর্শন বাবার সাথে কোক খেতে দেখে ঈদের ছুটির পর বন্ধুরা ছুটে এসে আমাকে বলছে এই চমন তোকে নাকি ঈদে কার সাথে কোক খেতে দেখা গেছে রে ….
বলনা.. বলনা ….কে রে !
আমি মিষ্টি হেসে গর্ব ভরে বলছি …আরে সে তো আমার আব্বা …
জানিস আমার বাবা দেখতে একদম আমির খানের মত !

সব মেয়ের কাছেই তার বাবা হিরো ।
আমারও এর একচুল ব্যতিক্রম ছিলো না, আজো আমার বাবাই আমার একমাত্র আদর্শ …আমার ভালবাসা …আমার জীবনের প্রথম এবং একমাত্র হিরো ।
বাবা’ তুমি যেখানেই আছো.. ভালো থেকো….
সেই আনন্দ ফুর্তি ও সেই সম্মান নিয়েই থেকো !

By | 2018-06-14T19:06:55+00:00 June 14th, 2018|স্মৃতি কথা|0 Comments

About the Author:

Leave A Comment

error: Content is protected !!