অলীক আঁধার – আফরোজা জাহান প্রভা

Home/ছোট গল্প/অলীক আঁধার – আফরোজা জাহান প্রভা

অলীক আঁধার – আফরোজা জাহান প্রভা

বাসা থেকে বাহির হবার সময় ঘড়িতে একবার তাকিয়ে ছিলাম , ভাবলাম শেষবারের মতো ঘড়িটা দেখে নেই। রাত সাড়ে ১২ টা। যেখানে যাবো হেঁটে যেতে প্রায় এক ঘন্টার মতো লাগবে। বাড়ি থেকে ব্রীজটার দূরত্ব পাঁচ কিলোমিটার হবে। আমি প্রায়ই রাতে হাঁটতে বের হই। রাতের নিরবতা, অন্ধকার আমায় অদ্ভুত টানে। আমার এমন ঘুরে বেড়ানো নিয়ে বাসায় আগে খুব ঝামেলা হতো। এখন কেউ তেমন কিছু বলে না। শুধু আমি যত রাতেই এই ভ্রমণ থেকে ফিরি না কেন, ঘরে ঢোকার ১০-১৫ মিনিটের মাঝে আম্মা আমার ঘরে ঢুকে। ব্যাপারটা আমি খেয়াল করে দেখেছি। কিন্তু আম্মা কিছু বলে না, শুধু তাকিয়ে থাকে। সেই চোখের দৃষ্টিতে মৃত হাসির উপর যেন ব্যথা বসে থাকে। আম্মার এই ব্যথিত চোখ দেখলে নিজেকে কেমন যেন অপরাধী লাগে। কিন্তু তেমন কিছু আমিও বলি না । মাঝে মাঝে শুধু বলি, আম্মা ঘরে যাও। ঘুমিয়ে পড়ো তো। আম্মা তাও কিছু বলে না, চোখজোড়াতে যেন আরও ব্যথা ফুটে উঠে, খোঁড়াতে খোঁড়াতে চলে যান কিছু ব্যথা ফেলে রেখে। সেই ব্যথা নিয়ে আমি বসে থাকি বাকি রাতটা, অপেক্ষা করি আলোর। যখন পায়ের ব্যথা বাড়ে আম্মা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে। আমি দেখি কিন্তু কখনোই বলি না আম্মা আপনার কি খুব কষ্ট হচ্ছে? আমি কেন কিছু বলতে পারিনা তা আমি জানি না। আজকাল আরও কিছু বলতে পারি না। বলতে নিলেই গলার কাছে সব কথা আটকে থাকে। তাই আমার আর কিছু বলা হয় না।
মেঘলা আকাশ তাই চাঁদ, তারা কিছুই নেই। ব্রীজের আলোর জন্য অন্ধকারটা এখানে জেঁকে বসেও যেন ঠিকমতো বসতে পারিনি। অন্যদিন হলে নদীর কুচকুচে পানির দিকে তাকিয়ে অনেক কিছু ভাবা যেত। আজ ভাবাভাবির কিছুই নেই। শুধু বুক ভরে শ্বাস নিয়ে টুপ করে কুচকুচে পানিতে নিজেকে সঁপে দিতে হবে। নিজেকে শেষ বারের মতো প্রস্তুত করছি।
– কি গো লাগবোনি?
রিনরিনে কন্ঠের সাথে গায়ে আলতো ধাক্কাতে চমকে গিয়ে পিছনে ফিরে তাকাতেই হলো বিপদ। শ্যাওলা জমে পিচ্ছিল হয়ে যাওয়া জায়গায় গিয়ে পা পড়লো। আর ওমনি পিছলে পড়ে গেলাম। এবং অজান্তেই একটা গ্রিল ধরে ফেললাম। সময় মতো ধরতে না পারলে আমি আজ…. ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো, এটা কি হলো? এতো সূবর্ণ সুযোগ ছিলো। আর আমি সুযোগটা এভাবেই হারিয়ে ফেললাম।
– ধরেন, আমার হাতটা ধরেন। এমুন কইরা তাক্যায়া আছেন ক্যান? ধরেন..
মেয়েটা হাত বাড়িয়ে আছে , ধরবো কি ধরবো না ভেবে শেষ পর্যন্ত ধরলাম। তার সাহায্যে উঠে দাঁড়ালাম। বুকটা ধড়ফড় করছে সেই সাথে পায়ে ব্যথা । ভালোমতো তাকিয়ে দেখি ডান পায়ের বুড়ো নখটা প্রায় উঠেই গেছে, গলগল করে রক্ত পড়ছে। আমি কিছু বলার আগেই মেয়েটা নিচু হয়ে ওড়নার এক কোণা ছিঁড়ে আমার আঙ্গুলটা বেঁধে দিচ্ছে । আমি যেন বাংলা সিনেমা দেখছি। ছোটবেলায় সপ্তাহে একদিন সিনেমা দেখার সেকি অপেক্ষা। ছবিতে নায়কের কিছু হলে নায়িকা ওড়না বা আঁচল ছিঁড়ে এভাবেই বেঁধে দিতো।
– দুখ লাগলে কইয়েন,আহা কি ব্যথাডা না পাইলেন। বলেই মেয়েটা বসা অবস্থায়ই আমার মুখের দিকে তাকালো।
এই প্রথম মেয়েটার চেহারা ঠিক মতো দেখলাম। ব্রীজের আলো তেড়চা ভাবে মুখে পড়েছে। কড়া মেকাপের আড়ালে বিষণ্ণ একজোড়া চোখ। সে আবার নিচু হয়ে রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করছে। বাঁধা শেষ করে উঠে দাঁড়ালো। আমি কিছু না বলে ব্রীজের কিনারে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমি জানি মেয়েটাকে আমার একটা ধন্যবাদ দেওয়া উচিত। কিন্তু আমি তো আজকাল কিছু বলতে চাইলেও বলতে পারি না। গলা দিয়ে স্বর বাহির হয় না। দূরে একটা স্টিমারের মৃদু আলো দেখা যাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে ভাবলাম আজকের এই মেঘলা রাতটা বড্ড ভালো ছিলো চলে যাবার জন্য। চলে যাবার জন্য এর চেয়ে ভালো দিন আর হয় না। এখনো দেরি হয়নি। কাজটা সেরে ফেলবে নাকি!
২.
– স্যার কয়টা বাজে কইতে পারেন? এবারও আমি চমকালাম। কিন্তু নিজেকে সামলে নিলাম।প্যান্টের পকেটে হাত দিলাম দেখি মোবাইলটা নেই। বুকেও হাত দিলাম, নাহ বুক পকেটই তো নেই। আজকাল বেশির ভাগ শার্টে বুক পকেট থাকে না। বুক পকেট জিনিসটা আমার খুব প্রিয়। ছোট বেলায় আমি যে শার্ট পরতাম, সেগুলোতে ছিলো। আমি আমার প্রিয় জিনিস যেমন- চকলেট, মার্বেল, চক, তেঁতুলের বিচি আরও কত কি যে রাখতাম। আম্মা হেসে বলতো, খোকনের আছে জাদুর থলে, হাত দিলেই কত কি পাওয়া যায়। আম্মার এই কথা শুনতে আমার কি যে ভালো লাগতো। আমি অযথাই হেসে কুটিকুটি হতাম। বাচ্চাকালে মানুষ কত অল্পতেই মুগ্ধ হয়,খুশিতে হাসে এই কথা ভেবে আজকাল আমার হাসি পায় ।আসলে জীবন সুন্দরের খামে মোড়ানো কোন সহজ কিছু নয়।
– স্যার ও স্যার।
মেয়েটা আমাকে স্যার বলে ডাকছে কেন? আমার পোশাক স্যারদের মতো না। গায়ে মলিন হয়ে যাওয়া একটা চেক শার্ট, প্যান্টটাও সাধারণ। পায়ে দেড়’শ টাকা দামের স্যান্ডেল। স্যারদের পোশাক এতো সাধারণ হয় না। স্যাররা আমার মতো এতো রাতে ব্রীজের উপর দাঁড়িয়ে থাকে না।
– জানি না সময়। আমার কাছে ঘড়ি, মোবাইল কিছু নাই। মনে পড়লো বাসা থেকে বাহির হবার সময় কম দামি মোবাইলটা বিছানার উপর রেখে এসেছি। সাথে একটা ছোট চিরকুট। তাতে লিখা –
আম্মা,
তোমার ওই ব্যথা ভরা চোখ দেখলে আমার খুব কষ্ট হয়। কিন্তু কষ্ট দূর করার মতো ক্ষমতা আমার নাই। মাঝে মাঝে মনে হইতো তোমার পায়ে একটু গরম গরম সরিষার তেল মালিশ করে দেই। কিন্তু কেন যেন দিতে পারতাম না, কত কথা বলতে মন চাইতো তাও পারতাম না। আমায় তুমি মাফ করে দিও আম্মা । তোমার এই বেকার ছেলেটা কখনোই তোমার কোন আশা পূরণ করতে পারে নাই। আমার এই ফোনটা তুমি ব্যবহার করো। ফোনে ৫০ টাকা আছে, জানি তোমার মাঝে মধ্যেই বড় ভাইয়ের কন্ঠ শুনতে মন চায়। সে তো আর আমাদের ফোন দিবে না, মাঝে মাঝে তুমিই তারে ফোন দিও। ভাইজান লিখা নাম্বারে ফোন দিলেই তুমি তার কন্ঠ শুনতে পারবা।
ইতি- তোমার খোকন

মেয়েটা আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, যেন কিছু বলতে চায়। কিন্তু কিছু বলতে পারছে না, মুখ নিচু করে আঙ্গুলে ওড়না প্যাঁচাচ্ছে। আমার সামনে যেন আমিই দাঁড়িয়ে আছি। ঠিক যেন আমার প্রতিমূর্তি, অনেক কথা বলতে চায়, কিন্তু কিছুই আর বলা হয় না। বড্ড অসহায়। মেয়েটা কিছু বলছে না, আমিও না। চারিদিকে নিরবতা, শুধু মাঝে মাঝেই শোঁ শোঁ করে দূরপাল্লার বাস আর মালবাহী ট্রাক ছুটে যাচ্ছে। ক্ষণিকের চঞ্চলতা দিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে। ব্রীজটা আবার গায়ে জড়াচ্ছে নিরবতার চাদর।
– স্যার, ব্রীজের নিচের ওই কোণাটা ভালা আছে। হাত দিয়ে দূরে ব্রীজের নিচের একটা জায়গা দেখালো। অন্ধকার বইলা কাজ সারতে পারবেন আরাম কইরা। স্যার যাবেন, বেশি না স্যার, মাত্র ২০০ ট্যাকা দিলেই চলবো।
আমি কিছু না বলাতে, মুখটা মলিন করেই বললো, আইচ্ছা ১৫০ টাক্যাই দিয়েন। আজ বাদলা বইলা তেমন কাউরে পাইতাছিনা। দুই ঘন্টা খাড়ায়া আছি। বলেই আমার খুব কাছে গা ঘেষে দাঁড়ালো। আমি এখানে প্রায়ই আসি। এখানে খুব একটা কেউ থাকে না। আমার মতো কিছু নিশাচর, কিছু চালচুলোহীন মানুষ আর নেশাখোরকে প্রায়ই দেখা যায়। কিন্তু এমন কাউকে আগে কখনো দেখেনি। যদিও গত কয়েকমাসে আসা হয়নি এইদিকটায়।
আমি একটু সরে আবার ব্রীজের গ্রিল ধরে দাঁড়াই। যে ভাবনা নিয়ে এসেছিলাম, আজ সব এলোমেলো হয়ে গেলো। সেই ভাবনার বদলে এখন আমার পারুলের কথা মনে পড়ছে । পারুল আমার দূর সম্পর্কের চাচাতো বোন। আগে প্রতি বছর একবার ওর সাথে দেখা হতো। খুব মায়াভরা একটা মুখ, দীঘির টলটলে জলের মতো স্বচ্ছ চোখ। সেই পারুলই অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় এক ঝড়ের রাতে পালিয়ে গেলো প্রেমিকের হাত ধরে। ছেলেটা পাশের গ্রামের । একবছর পর ছেলেটা ফিরে এলো ঠিকই কিন্তু পারুলকে ছাড়া। তখন আমিও গিয়েছিলাম গ্রামে, ছেলেটার মুখোমুখিও হয়েছিলাম। সে একটা সস্তা বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে ছোট ছোট চোখ করে বলেছিলো, আপনের বইনের চরিত্রে দোষ। গেলো আমার লগে, শহরে গিয়া আরেক পোলার লগে ভাগছে। বলেই পারুলকে একটা মারাত্নক গালি দিয়ে চলে গেলো। আমি এতোই অবাক হলাম, প্রতিবাদ করার বদলে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমার বোনটা আবার অন্যকারো সাথে পালিয়ে গেলো, আসলেই!
একদিন আমরা বুঝতে পারলাম পারুকে আমরা হারিয়ে ফেলেছি চিরদিনের জন্যে।
৩.
ব্রীজের এই জায়গাটা আসলেই অন্ধকার। একসাথে তিন-চারজন থাকলেও কাছে না আসলে বোঝা যাবে না এখানে কেউ আছে। আমি দাঁড়িয়ে আছি। মেয়েটা আমার সামনে। নিরবতাটা মেয়েটাই ভাঙ্গলো। একটা দ্বীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো- গল্প শুনবার চান? আমাদের শরীর ছাড়া কোন গল্প নাই। মানুষ আমাদের শরীরে গল্প এঁকে আমাদেরই নষ্টা বলে।
মেয়েটা এতোক্ষণ খুব টেনে অশুদ্ধ ভাবে কথা বলছিলো, এখন কথার মাঝে সেই গ্রাম্য অশুদ্ধতার টান তেমন একটা নেই। আমি শুধু অস্ফুট স্বরে বললাম, এই লাইনে কিভাবে?
অন্ধকারে চোখ সয়ে এসেছে বলে, হালকা অবয়ব দেখা যাচ্ছে। মনে হলো ফুঁপিয়ে উঠলো মেয়েটা। ফুঁপিয়েই বলে উঠলো, আগে তো কেউ কখনো জিজ্ঞেস করে নাই আমি এই ধান্দায় ক্যান! স্যার আপনি কি করবেন জেনে? আপনি কি পুলিশের লোক?
না বলাতেই আবার শুরু করলো- এই দিনে কাস্টমার পাওয়াটা কঠিন। স্যার ১৫০ টাকা দিবেন তো?
কোনমতে বললাম – হু
দুনিয়াতে ভালোবাসার মতো ঠকাইন্যা জিনিস আর নাই স্যার। ভালোবাইসা যে ঠক টা খাইলাম। আমারে চার বছর আগে বিয়ে করবো কইরা ঢাকায় আসার পর নষ্ট করলো আমার প্রেমিক। তাও করছে করছে, আমি তো তারে ভালোবাসতাম তাই কষ্ট হইলেও মেনে নিছিলাম। কিন্তু সে আমারে নষ্টা কইরা বিয়ে করবো বইলা নিলো এক বাড়িতে। ঘুমায় পড়ছিলাম স্যার। উঠার পর দেখি সে নাই। দালালের কাছে বিক্রি করে দিয়া গ্যাছে। পালাতে চাইছিলাম পারি নাই। মরারও চেষ্টা করছিলাম, পরে ভাবলাম কেন আমি মরবো? ক্যান ? আমি তো চাইনি আমার জীবনটা এমন হোক। তয় আমি কেন মরবো। জানি সমাজ আমারে গালি দেয়, নষ্টা, মাগী আরও কত কি বলে । এখন শরীরে যন্ত্রণা হলেও সহ্য করি আর হাসি। কেউ কি একলাই নষ্টা হয় স্যার? আপনার মতো ব্যাডারাই তো……
মেয়েটা চুপ হয়ে গেলো। নিরবতা ভেঙ্গে একটা গাড়ি কেন যেন খুব জোরে হর্ণ বাজিয়ে ছুটে গেলো, আবার নিরব হয়ে গেলো সব।
– স্যার রাগ করলেন? রাগ কইরেন না । আপনারে আমি খারাপ কই নাই। আপনি তো তাদের মতো আমারে এখনো কোন গালিও দেন নাই। একবারও হাত দেন নাই গায়ে । আমার কথায় কিছু মনে কইরেন না। আমার গল্প শ্যাষ। এইবার কাম শুরু করি।
মেয়েটা আমার কাছে এসে ওড়নাটা গা থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিলো মাটিতে। আমি বুঝে উঠার আগেই আমার শার্টে হাত দিলো। আমি এক ঝটকায় হাতটা ধরে শুধু বললাম,
– পারু, বাড়ি চল। আমাদের বাঁচতে হবে।

By | 2018-06-14T19:15:28+00:00 June 14th, 2018|ছোট গল্প|0 Comments

About the Author:

Leave A Comment

error: Content is protected !!